আমাদের মানচিত্র  |  বর্ষ: ১, সংখ্যা: ৩৯     ঢাকা, বাংলাদেশ  |  আজ সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮  |  




আর্কাইভ সংখ্যা - নির্বাচন হচ্ছে তবে...

আর্কাইভ সংখ্যার প্রচ্ছদ



বর্ষ: ১, সংখ্যা: ৩৯
রবিবার, ৫ জানুয়ারী ২০১৪




 
একনজরে এই সংখ্যা -

  প্রচ্ছদ প্রতিবেদন : নির্বাচন! অতপর......
  সম্পাদকীয় : সংসদ নির্বাচন ও আমাদের প্রত্যাশা
  সাহিত্য : শিরোমণি আলাওল
  অনুসন্ধান : ডাবল ভ্যাটের ফাঁদে সুপারশপের ক্রেতারা
  ফিচার : গাইড
  যাপিত জীবন : স দা চা র শি ক্ষা
  প্রতিবেদন : দুঃসময়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প!ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে
  স্মরণ : নেলসন ম্যান্ডেলা মাদিবা: কাছে থেকে দেখার কিছু সুখস্মৃতি
  রাজনীতি : রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা, প্রধানমন্ত্রীর চোখে সমৃদ্ধির স্বপ্ন
  বিশ্লেষণ : নির্বাচন বর্জনে তারেকের ভিডিও ও সিনিয়র নেতাদের ভূমিকায় খালেদার সন্দেহ!
  ইনফোটেক : বায়োপ্লাস্টিক: আগামীদিনের খাবার
  সমকালীন : ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে
  প্রতিবেদন : আগামি সংসদে যেতে চানহত্যা মামলার আসামি ১২, ব্যবসায়ী ৫২, এসএসসি’র নিচে ১৭ ভাগ প্রার্থী
  কলাম : হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ...
  ভ্রমণ : সাজেক-এ একদিন
  বিশেষ প্রতিবেদন : ভারত-মার্কিন বন্ধুত্বের জটিলতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ইস্যু দেবযানী
  সম্পাদকীয় : বিএনপি’র রাজনৈতিক ভুল ও দশম সংসদের যাত্রা শুরু
 



সাহিত্য পড়া হয়েছে ৩৬৬৪ বার

শিরোমণি আলাওল

নুরুল আমিন রোকন

বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক প্রণয় কাব্যধারায় এক অবিস্মরণীয় নাম ‘আলাওল’। যার আবির্ভাব হয়েছিল আরাকান রাজসভার প্রধান কবি হিসেবে। যিনি পরে হয়ে উঠেছিলেন ‘শিরোমণি আলাওল’। ধর্মীয় বিষয়বস্তুর গতানুগতিক ছকের মধ্যে থেকেও বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে রোমান্টিক প্রণয় কাব্যধারার প্রবর্তনকারী হিসেবে মুসলমান কবিদের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। এধারার কবিরা সেসময় আরবি, ফারসি ও হিন্দি সাহিত্যের বিষয়বস্তু ও ভাববৈচিত্র্য অবলম্বন করে প্রণয়কাব্য রচনার মাধ্যমে এক নতুন যুগের সৃষ্টি করেন। আর আলাওল হয়ে ঊঠেন এ ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। মহাকবি আলাওল মধ্যযুগের বাঙালি কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারি হিসেবে হয়ে ঊঠেন ‘শিরোমণি আলাওল।’ মধ্যযুগের প্রণয়কাব্যধারার কবিদের কবিত্ব শক্তির সার্বিক বৈশিষ্ট বিচারে আলাওলই শীর্ষস্থানীয় কবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। কবির মৃত্যুর প্রায় একশত বছর পর কবি মুহম্মদ মুকিম এর ‘গুলে বকাওলী’ কাব্যের বর্ণনায় আলাওলকে যেভাবে স্মরণ করা হয়েছে তা তুলে ধরা হলোঃ
গোড়বাসী রইলো আসি রোসাঙ্গের ঠাম।
কবিগুরু মহাকবি আলাওল নাম ॥
শিরোমণি আলাওল মরণে জিওন।
শেষ গুণী গুরু মানি প্রণামি চরণ ॥
সে আমলে কবি আলাওলই ছিলেন বহু বিদ্যায় বিদ্যান। তিনি ছিলেন আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত এবং ব্রজবুলি ও মঘী ভাষাও ছিল তার আয়ত্তে। শুধু কবিত্বেই নয়, বহু শাস্ত্র বিষয়েও আলাওল ছিলেন বিজ্ঞ পণ্ডিত। কামশাস্ত্র, আধ্যাত্মবিদ্যা, যোগশাস্ত্র, প্রাকৃতপৈঙ্গল, ইসলাম ধর্ম ও হিন্দু ধর্মশাস্ত্র কার্যকরণ পদ্ধতি, যুদ্ধবিদ্যা, নৌকা ও অশ্বচালনায় বিশেষ পারদর্শিতার গৌরবোজ্জ্বল অধিকারি আলাওল সমগ্র মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য প্রতিভা, দেদীপ্যমান এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র। তার জন্মস্থান ও জন্মকাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে নানামতের অবতারণা হলেও এক পর্যায়ে কবির স্বঘোষিত উক্তিকে মেনে নিয়ে সকলেই একমত হয়েছেন যে, আলাওল বাংলাদেশের ফরিদপুরের লোক ছিলেন। এ প্রসঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছেন,‘কবির আদি বাসস্থান যে ফতেহাবাদের জালালপুর ছিল তাহা কবির আত্মপরিচয় হইতে পাওয়া যায়।...এই ফতেহাবাদ বর্তমান ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত একটি পরগনা ছিল। এই ফতেহাবাদ পরগনার জালালপুর সম্ভবত কবির জন্মস্থান।’ ড. মুহম্মদ এনামুল হক মনে করেন আলাওলের জন্ম হয়েছিল চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার জোবরা গ্রামে। কিন্তু এই মতবাদের পক্ষে কোন তথ্য উপাত্ত ও যুক্তি খোঁজার প্রয়োজন হয়নি এ কারণে যে, কবি আলাওল নিজেই তার লেখায় ইঙ্গিত করে গেছেন জন্মস্থান সম্পর্কে। সে লেখায় ঊল্লেখ পাওয়া যায় ফরিদপুর জেলার জালালপুরে তার জন্ম হয়েছিল এবং কবির পিতা ছিলেন ফতেহাবাদের রাজ্যেশ্বর মজলিস কুতুবের মন্ত্রী। পণ্ডিতদের সবাই এ উক্তি সাদরে গ্রহণ করেন এবং জন্মস্থান নিয়ে ভিন্নমতের অবসান হয়। এ সম্পর্কে কবি আলাওল তার বিখ্যাত ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের আত্মকথা পর্বে এবং ‘সেকান্দর নামা’ কাব্যে যা লিখেছেন নিম্নে তা তুলে ধরা হলোঃ
মুল্লুক ফতেয়াবাদ গৌড়েতে প্রধান।
তথাতে জালালপুর অতিপূণ্য স্থান ॥
বহু গুনবন্ত বৈসে খলিফা ওলেমা।
কথেক কহিব সেই দেশের মহিমা ॥
মজলিস কুতুব তথাত অধিপতি।
মুই দীন হীন তান অমাত্য সন্ততি ॥
কার্যহেতু যাইতে পন্থে বিধির ঘটন।
হার্মাদের নৌকা সঙ্গে হৈল দরশন ॥
বহু যুদ্ধ আছিল শহীদ হৈল তাত।
রণক্ষেত্র ভোগযোগে আইলু এথাত ॥
কহিতে বহুল কথা দুঃখ আপনার ॥
রোসাঙ্গে আসিয়া হৈলুঁ রাজ-আসোয়ার ॥
বহু বহু মুসলমান রোসাঙ্গে বৈসন্ত।
সদাচারী,কুলীন,পণ্ডিত, গুণবন্ত ॥
সবে কৃপা করন্ত সম্ভাষি বহুতর।
তালিম আলিম বলি করন্ত আদর ॥
   ‘সেকান্দর নামা’ কাব্যে মহাকবি আলাওল তার আত্মপরিচয় অংশে লিখেছেনঃ
গৌড় মধ্যে প্রধান ফতেহাবাদ ভূম।
বৈসে সাধু সৎ লোক হর্ষ মনোরম ॥
অনেক দানেশমন্দ খলিফা সুজন।
বহুত আলিম গুরু আছে সেই স্থান ॥
হিন্দুকুলে মহাসভ্য আছে ভট্টাচার্য।
ভাগীরথী গঙ্গা ধারা বহে মধ্যে রাজ্য ॥
রাজ্যেশ্বর মজলিস কুতুব মহাশয়।
আমি ক্ষুদ্রমতি তান অমাত্য তনয় ॥
কার্যহেতু পন্থক্রমে আছে কর্ম লেখা।
দুষ্ট হারমাদ সঙ্গে হই গেল দেখা ॥
বহু যুদ্ধ করিয়া শহীদ হৈল বাপ।
রণক্ষতে রোসাঙ্গে আইল মহাপাপ ॥
না পাইল সৎ পদ আছে আঙ্গলেস।
  রাজ আসোয়ার হৈনু আসি এই দেশ ॥
রোসাঙ্গেতে মুসলমান যতেক আছেন্ত।
তালিব আলিম বলি আদর করেন্ত ॥
বহু মহন্তের পুত্র মহা মহা নর।
নাট গান সঙ্গীত শিখাইনু বহুতর ॥
বহুল মহন্ত লোক কৈল গুরু ভাব।
সকলের কৃপা হন্তে ছিল বহু লাভ ॥
এ ধরণের আত্মপরিচয়মূলক বিবরণী কবি আলাওল তার সকল কাব্যেই লিখে গেছেন। নানামুখী কঠিন বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই কেটেছে আলাওলের জীবনের অনেক সময়। অল্প বয়সেই তিনি হয়েছিলেন পিতৃহারা এবং বাস্তুহারা। রাজ অমাত্যের সন্তান হয়ে অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও জীবনে তিনি নিরবচ্ছিন্ন সুখ ভোগের অধিকারী হতে পারেন নি। তার লেখায় পাওয়া যায় কার্যোপলক্ষে কবি তার পিতার সঙ্গে পানিপথে গমণকালে পর্তুগীজ জলদস্যুদের কবলে পড়েন। যুদ্ধ হয় জলদস্যুদের সঙ্গে। প্রাণপণ যুদ্ধ করে নিহত হন কবির পিতা। তিনিও আহত হন। এরপর বহু দুঃখ ভোগের শিকার হয়ে উপস্থিত হন আরাকানে। সেখানে তিনি রাজ-আসোয়ার বা অশ্বারোহী হিসেবে চাকরি নেন মগ রাজার সেনাবাহিনীতে। এর পর অল্প সময়ের ব্যবধানেই তিনি খ্যাতি লাভ করেন সঙ্গীতবিদ ও গায়ক হিসেবে। এই খ্যাতির বদৌলতে সঙ্গীত শিক্ষকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে সুযোগ পান উচ্চমহলের সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগের। ক্রমেই অভিজাত সমাজে ছড়িয়ে পড়তে থাকে আলাওলের উচ্চমার্গের কলাজ্ঞান ও বিদ্যা বুদ্ধির কথা। এই সুবাদে তিনি আশ্রয় লাভ করেন আরাকানের প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের কাছে। বলে রাখা দরকার ইনিই হচ্ছেন গুণশালী ও বহুশাস্ত্রবিদ কবি কোরেশী মাগন ঠাকুর। মাগন ঠাকুরের কাছে আশ্রয় লাভের সময় থেকেই মূলত আলাওল কাব্য সাধনায় পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে শাহ সুজা এই সময়ে আরাকান রাজের আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরপর রাজার বিরাগভাজন হয়ে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে শাহ সুজা প্রাণ হারান এবং আলাওলও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কারারুদ্ধ হন। ৫০ দিন পর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে দিন কাটাতে থাকেন অসহনীয় কষ্টে। এই কষ্টে কষ্টে কেটে যায় এগারটি বছর। কষ্টের যেন আর শেষ নেই, এ সময়ে মাগন ঠাকুরের মৃত্যু হলে তিনি পড়েন আরও দুর্গতিতে। এমনিভাবে সময় যেতে যেতে ক্রমান্বয়ে তিনি রোসাঙ্গ রাজ অমাত্য সৈয়দ মুসা, সমরসচিব সৈয়দ মুহম্মদ খান, রাজমন্ত্রী নবরাজ মজলিস এবং অন্যতম প্রধান সচিব শ্রীমন্ত সোলেমান প্রমুখ সভাসদবর্গের অনুগ্রহ লাভ করেন। এ সময়ে তিনি জীবিকার জন্যে রাজদেহরক্ষীর কাজ নিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও কবির জীবনে উত্থান পতনের কোন কমতি ছিল না। তাকে চলতে হতো বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকের মন তুষ্ট রেখে। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ছিলেন কারাবন্দি। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় জীবনের বেশ কিছু সময় কাটাতে হয়েছে অন্যের সাহায্যনির্ভর হয়ে। এত দুঃখ-কষ্টের আগুন হয়তো পুড়ে পুড়ে তাকে খাঁটি সোনায় পরিণত করেছিল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কবি আলাওলের জীবনকাল নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছেন, তার জন্ম আনুমানিক ১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন সম্ভবত ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে। তার মতে আনুমানিক জীবনকাল হচ্ছে ৭৬ বছর। ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে আনুমানিক ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৭৩ বছর আলাওলের জীবনকাল। ড. আহমদ শরীফ আলাওলের জন্মসাল ধরেছেন আনুমানিক ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ এবং ১৬৭৩ থেকে ১৬৮০ সালের মধ্যবর্তী যে কোন সময় তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন, অর্থাৎ আনুমানিক ৭৫ বছর বেঁচে ছিলেন। সৈয়দ আলী আহসান কবি আলাওলের জন্ম এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতের সাথে একমত পোষণ করেছেন, অর্থাৎ (১৫৯৭-১৬৭৩) খ্রিস্টাব্দ। কবির জীবনকাল সম্পর্কে যথার্থ এবং সুনির্দিষ্ট জন্ম মৃত্যুর তারিখ পাওয়া না গেলেও উপরোল্লিখিত গবেষকদের মতামতের ক্ষেত্রে দেখা যায় একজন ৭৩ বছর, একজন ৭৫ বছর, এবং দুইজন ৭৬ বছর কবির বেঁচে থাকার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। জন্ম এবং মৃত্যু সালের ক্ষেত্রেও চার জনের মধ্যে দুইজন (১৫৯৭-১৬৭৩), একজন (১৬০৭-১৬৮০), একজন (১৬০৫-১৬৭৩/১৬৮০) খ্রিস্টাব্দের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। সুতরাং এখানে (১৫৯৭-১৬৭৩) অধিকাংশের মতামত হওয়ায় এ মতের সাথে একাত্মতা পোষণ করাই শ্রেয় বলে মনে করি।
কবি আলাওল বহু গ্রন্থের রচয়িতা এমন ইঙ্গিত বিভিন্ন লেখায় পাওয়া গেলেও, বাস্তবে এখনও পর্যন্ত তার রচিত অধিকাংশ পুস্তকই আবিস্কৃত হয়নি বলেই অনুমান করা হয়। এখন পর্যন্ত কবির যে ক’টি গ্রন্থের প্রকাশ এবং পরিচয় পাওয়া গেছে সেগুলো হচ্ছে ১.পদ্মাবতী, ২.সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল, ৩.সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী, ৪.সপ্তপয়কর, ৫.তোহফা, ৬.সেকান্দর নামা, ৭.সঙ্গীত শাস্ত্র (রাগতাল নামা) ও ৮.রাধাকৃষ্ণ রূপকে রচিত পদাবলী। তার প্রথম ও শ্রেষ্ঠ কাব্য হিসেবে বিবেচিত হয় পদ্মাবতী। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে অযোধ্যার কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর রচিত বিখ্যাত হিন্দি কাব্য ‘পদুমাবত’ এর স্বাধীন অনুবাদ করে রচিত হয় ‘পদ্মাবতী’ কাব্য। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ সাদ উমাদার বা থদোমিন্তারের আমলে (১৬৪৫-৫২) কোরেশী মাগন ঠাকুরের আদেশে তিনি এ কাব্য রচনা করেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যে ক’জন প্রভাবশালী কবি কাহিনী রূপায়ন, চরিত্র নির্মাণ এবং প্রকাশভঙ্গির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যপূর্ণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন আলাওল এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের দাবিদার। আধ্যাত্মরসের একটি কাব্যকে মানবিক রসপূর্ণ কাব্যে রূপায়নের ক্ষেত্রে আলাওলের দৃষ্টি এখানে নিবদ্ধ হতে দেখি আনন্দ ও সৌন্দর্য উপভোগের দিকে। কবি তাই বলেছেন ‘স্থানে স্থানে প্রকাশিলু নিজ মন উক্তি।’ পদ্মাবতী কাব্যটি প্রেমমূলক ঐতিহাসিক কাব্য হলেও এতে প্রেমের স্বরূপই প্রধান্য পেয়েছে, ইতিহাস নয়। চিতোরের রাণী পদ্মিনীর কাহিনী এ কাব্যে রূপায়িত হয়েছে। অপূর্ব সুন্দরী পদ্মাবতীর স্বামীর নাম রতœসেন। রাঘবচেতন নামের জনৈক ব্রহ্মণ পণ্ডিত চিতোরের রাজসভায় একদা লাঞ্চিত হন। সুযোগ বুঝে তারই প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দীনের কাছে পদ্মাবতীর অপরূপ রূপের প্রশংসা করে সম্রাটকে প্ররোচিত করেন পদ্মাবতীকে অপহরণ করতে। রতœসেনের কাছে পদ্মাবতী সম্বন্ধে অনুরূপ প্রস্তাব দিয়ে আলাউদ্দীন প্রত্যাখ্যাত হন এবং প্রতিশোধ নিতে চিতোর আক্রমণ করেন। উভয় পক্ষের যুদ্ধে রতœসেন বন্দি হন। কিন্তু বিশ্বস্ত অনুচরদের সাহায্যে তিনি আবার মুক্ত হন। এর পর রাজা দেওপালের সাথে যুদ্ধ বাঁধে রতœসেনের। এ যুদ্ধে দেওপাল নিহত হন এবং আহত হন রতœসেন। এ সময় সুযোগ বুঝে আলাউদ্দীন পুনরায় চিতোর আক্রমণ করেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই রতœসেনের মৃত্যু হয় এবং সহমৃতা হন পদ্মাবতী। যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আলাউদ্দীন চিতোর পৌঁছে দেখতে পেলেন পদ্মাবতী-রতœসেনের জ্বলন্ত চিতা। তাই চিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি ফিরে গেলেন দিল্লি। আলাউদ্দীনের চিতোর অভিযানের কাহিনী ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তাতে পদ্মিনী সংক্রান্ত কোন কথার উল্লেখ নেই। যৎসামান্য ইতিহাস ভর করে দেশের চারণ কবিরা রাজপুত-বীরদের যে গল্প কাহিনী গেয়ে বেড়াতেন কবি জায়সী হয়তো বা তারই রূপ বর্ণনা করে রচনা করেছিলেন পদুমাবত কাব্য। এ কারণে জায়সীর কাব্যে সব সময় ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। ধর্মমতে সুফী সাধক এবং কাব্যকলা বিচারে রোমান্টিক আখ্যান লেখক ছিলেন কবি জায়সী। মূলত তিনি আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যেই রূপক প্রকরণ গ্রহণ করেছিলেন।
রূপক কাব্য হিসেবেই রচিত হয়েছিল কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবত। অতি অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল প্রতিভাবান এই লেখকের হাতে ঠেট ভাষায় রচিত অতি সহজ বুলি, গল্পরসপূর্ণ ও সুক্ষ্ম তত্ত্বসমন্বিত কাম-প্রেমকথা সম্বলিত কাব্য। আর তাই পদুমাবত হয়ে উঠেছিল প্রেমিকের কাছে প্রেম ও কামতত্ত্ব, ভাবুকের কাছে জীবাত্মা-পরমাত্মাবিষয়ক তত্ত্বের আকর, আর সাধারণ বইপ্রেমী পাঠকের কাছে বাস্তব ঘটনামিশ্রিত রসকাব্য হিসেবে পরিচিত।
ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন ‘পদ্মাবতী উপাখ্যান মালিক মুহম্মদ জায়সীর নানা সময়ের নানা ঐতিহাসিক ও অনৈতিহাসিক বৃত্তান্তে জোড়া দেওয়া একটি কাব্যমাত্র। তিনি ইতিহাস লিখিতে বসেন নাই। তিনি তাঁহার কাব্যে সুফী মতের ব্যাখ্যার জন্য আদি রসের আবরণে এক আধ্যাত্মিক রূপক কাব্য রচনা করিয়াছেন।’ এই জায়সীকেই অনুসরণ করেছেন কবি আলাওল। এ কারণে পদ্মাবতী কাব্যে ইতিহাসের ছায়া লক্ষ্য করা গেলেও-ইতিহাসনির্ভর নয়, বরং কবির লক্ষ্য ছিল প্রণয়োপাখ্যান রচনার দিকেই। জায়সী ছিলেন সুফী এবং প্রেমমার্গীয় অধ্যাত্ম রসের কবি। রোমান্টিক কাব্যের রূপকের অন্তরালে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন অধ্যাত্ম তত্ত্বের স্বরূপ। কবি জায়সীর রূপক অর্থে চিতোর হচ্ছে দেহ, মন রাজা, সিংহল হৃদয়, পদ্মিনী বুদ্ধি, শুক পাখি গুরু, নাগমতি জগতের রূপ বর্ণনা আর আলাউদ্দীন হচ্ছে মায়াবদ্ধ জীব। প্রেম নিষ্ঠা ছিল বলেই রতœসেন পদ্মাবতী লাভ করতে পেরেছেন, কিন্তু দেওপালের প্রেমে ছিল পার্থিব বাসনা, তাই তার পক্ষে পদ্মাবতী লাভ সম্ভব হয়নি। এ বৈশিষ্ট্য স্রষ্টা লাভের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। কবি হিসেবে আলাওল সুফী মতানুসারী হলেও তার রচিত ‘পদ্মাবতী’ হচ্ছে প্রকৃত মানবপ্রেমের কাহিনী। জায়সী ও আলাওলের রচনাদর্শ সম্পর্কে ড.ওয়াকিল আহমদ বলেছেন ‘জায়সীর অভিজ্ঞতা ও আলাওলের অভিজ্ঞতা এক নয়। জায়সীর মানস পরিমণ্ডল গঠনে ধ্যান ছিল, সাধনা ছিল। তিনি অধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণাকে অঙ্গীকার করে কাহিনী পরিকল্পনা করেছেন। আলাওল জায়সীর কাব্যের রূপকতত্ত্ব বুঝতে পারেন নি এমন নয়, তিনি অনুবাদে তা রক্ষা করতে পারেন নি। এমনও হতে পারে রাজসভার বিলাসী, বর্ণাঢ্য রঙ্গপ্রিয় পাঠকেরা গল্পের অনন্দ চেয়েছিলেন, তত্ত্বের গরিমা চান নি। আলাওল কাহিনীর গ্রহণ-বর্জন করে পাঠকের মানসিক সে চাহিদা পূরণ করেছেন।’ 
আলাওল পদ্মাবতী রচনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে জায়সীর উপর নির্ভরশীল হয়েও বর্ণনা পদ্ধতিতে বিশিষ্টতা এনে এবং বিশেষ কিছু সংযোজনের মাধ্যমে স্বকীয়তার পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছেন। উভয়ের কাহিনীতেও লক্ষ্য করা যায় পার্থক্য। আলাওল কোন কোন ক্ষেত্রে হেঁটেছেন মূল ছেড়ে ভিন্ন পথে, আবার কোথাওবা সংযোজন করেছেন নতুন অধ্যায়, পরিবর্তিত হয়েছে বর্ণনার ধারাও। রূপ বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি অনুসরণ করেছেন অনুবাদের পথরেখা, তবে সেখানেও তিনি নিজস্ব ভাব কল্পনার পরিচয় দিয়েছেন যথেষ্ট পরিমানে। তার কাব্যের সর্বত্রই পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানের পরিচয় সুস্পষ্ট, কারণ তার অনুবাদের প্রায় সবটাই হচ্ছে ভাবানুবাদ। কবি আলাওল হচ্ছেন পণ্ডিত কবি। পাণ্ডিত্য ও কবিত্বের সংমিশ্রণ ঘটেছে তার কাব্যে। কবি আলাওল রতœসেন সম্পর্কে যা লিখেছেন তা তার পাণ্ডিত্য সম্পর্কেও বিবেচিত হতে পারে সত্য রূপেঃ
শাস্ত্র ছন্দ পঞ্জিকা ব্যাকরণ অভিধান।
একে একে রতœসেন করিল বাখান ॥
সঙ্গীত পুরাণ বেদ তর্ক অলঙ্কার।
নানা বিধ কাব্য রস আগম বিচার ॥
নিজে কাব্য যতেক করিল নানা ছন্দ।
শুনিয়া পণ্ডিতগণ পড়ি গেল ধন্দ ॥
সবে বলে তান কণ্ঠে ভারতী নিবাস।
কিবা বররুচি ভবভূতি কালিদাস ॥
এ প্রসঙ্গে ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অভিমত এই যে ‘বাস্তবিক তাহার সমান নানা বিদ্যাবিশারদ পণ্ডিত সে যুগে আর কেহই ছিল না।’ আলাওলের পাণ্ডিত্যের বিচিত্র প্রকাশ তার পদ্মাবতী কাব্যে লক্ষণীয় বিষয়। তিনি সর্বক্ষেত্রে জায়সীর উত্তরাধিকার নন। তার নিজস্ব জ্ঞান ভাণ্ডারের বিচার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়। বিশেষ করে চিকিৎসাশাস্ত্র, ছন্দশাস্ত্র, চৌগান খেলা, অষ্টনায়িকাভেদ শাস্ত্র, অশ্বচালনা বিদ্যা, বিবাহাচার, সঙ্গীত শাস্ত্র প্রভৃতি ক্ষেত্রে আলাওলের মৌলিক জ্ঞানের সুস্পষ্ট পরিচয় মেলে। বিভিন্ন বিষয়ে রচিত কাব্যের পংক্তিতে পংক্তিতে প্রকাশ ঘটেছে আলাওলের পাণ্ডিত্য। প্রেম, রূপ, জ্যোতিষশাস্ত্র মতে যাত্রার শুভ-অশুভ ইত্যাদি বিষয়ে পদ্মাবতী কাব্যে তার নিজস্ব কবিত্ব শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনার একটি স্তবক উদ্ধৃত করা হলোঃ
প্রভারুণ বর্ণ-আখি সুচারু নির্মল।
লাজে ভেল জলান্তরে পদ্ম নীলোৎপল ॥
কাননে কুরঙ্গ জলে সফরী লুকিত।
খঞ্জন গঞ্জন নেত্র অঞ্জন রঞ্জিত ॥
আঁখিত পুত্তলি শোভে রক্ত স্বেতান্তর।
তুলিতে কমল রসে নিচল ভ্রমর ॥
কিঞ্চিত লুকিত মাত্র উথলে তরঙ্গ।
অপাঙ্গে ইঙ্গিতে হএ মুনিমন ভঙ্গ ॥
পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনায় কবির স্বকীয় কবিত্ব শক্তির বৈশিষ্ট্য নিঃসন্দেহে তাকে মধ্য যুগের অপরাপর সকল কবির ঊর্ধ্বে স্থান করে দেয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে কবি প্রতিভার তুলনামূলক বিচারের মাধ্যমে ড.ওয়াকিল আহমদ বলেছেন ‘অন্যান্য কবির গুণগুলো কমবেশি আলাওলের মধ্যে আছে, কিন্তু আলাওলের সব গুণ একত্রে কোন কবির মধ্যে নেই। আলাওল গীতিকবি, আখ্যানকবি, তাত্ত্বিক কবি। তিনি সাধক ও গায়ক। তিনি বহুভাষাবিদ, বহুশাস্ত্রবিদ। এক কথায় তিনি রাজসভার পণ্ডিত কবি। কবিত্বের সামগ্রিক বিচারে আলাওল ‘মহাকবি’ আখ্যায় ভূষিত হওয়ার সম্পূর্ণ যোগ্য।’
ড.দীনেশচন্দ্র সেন আলাওলের কবিত্ব শক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন ‘কবি পিঙ্গলাচার্যের মগণ, রগণ প্রভৃতি অষ্ট মহাগণের তত্ত্ববিচার করিয়াছেন, খণ্ডিতা, বাসকসজ্জা ও কলহান্তরিতা প্রভৃতি অষ্ট নায়িকাভেদ ও বিরহের দশ অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলোচনা করিয়াছেন, আয়ুর্বেদ শাস্ত্র লইয়া উচ্চাঙ্গের কবিরাজি কথা শুনাইয়াছেন, জ্যোতিষ প্রসঙ্গে লগ্নাচার্যের ন্যায় যাত্রার শুভা শুভের এবং যোগিনীচক্রের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করিয়াছেন, একজন প্রবীণা এয়োর মত হিন্দুর বিবাহাদি ব্যাপারে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আচারের কথা উল্লেখ করিয়াছেন ও পুরোহিত ঠাকুরের মত প্রশান্তি বন্দনার উপকরণের একটি শুদ্ধ তালিকা দিয়াছেন, এতদ্ব্যতীত টোলের পণ্ডিতের মত অধ্যায়ের শিরোভাগে সংস্কৃত শ্লোক তুলিয়া ধরিয়াছেন।’ তবে কোথাও কোথাও কবি পাণ্ডিত্যের গভীরতায় নিমজ্জিত  হয়ে কাব্যকলার দাবি গৌণ করে দেখায় কেউ কেউ তাকে পাণ্ডিত্যভারে পীড়িত বলেও মন্তব্য করেছেন।
আরাকান রাজের প্রধান অমাত্য মাগন ঠাকুরের অনুপ্রেরণায় ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে কবি আলাওল ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান’ রচনা আরম্ভ করে মাগন ঠাকুরের মৃত্যুতে শোকে মূহ্যমান হয়ে রচনা বন্ধ করে দেন। পরে আনুমানিক ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ মুসার অনুরোধে তা সমাপ্ত করেন। এটি তার দ্বিতীয় কাব্য।
দৌলত কাজীর অসমাপ্ত গ্রন্থ ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’র অবশিষ্টাংশ আরাকানরাজ শ্রীচন্দ্র সুধর্মার অমাত্য সোলেমানের উৎসাহে ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে সমাপ্ত করেন আলাওল। এটি তার তৃতীয় রচনা। তবে এতে তার নিজস্ব সংযোজন হিসেবে ‘রতনকলিকা আনন্দবর্মার উপাখ্যান’ খ্যাত। পারস্য কবি নিজামী গঞ্জভীর ‘হপ্তপয়কর’ কাব্যের অনুবাদ করেন আলাওল। অন্যান্য কাব্যের মত এটিও তার ভাবানুবাদ। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজের সমরমন্ত্রী সৈয়দ মুহম্মদের অনুরোধে ‘সপ্তপয়কর’ নামে এ কাব্য রচনা করেন। এটি আলাওলের চতুর্থ কাব্য।
বিখ্যাত সুফী সাধক শেখ ইউসুফ গদা দেহলভীর ‘তোহফাতুন নেসায়েহ’ নামক ফারসি গ্রন্থের অনুবাদ ‘তোহফা’ আলাওলের পঞ্চম গ্রন্থ। ১৬৬৪ সালে তিনি এ কাব্য রচনা করেন। এ কাব্যে কবি নিজের অবস্থা সম্পর্কে লিখেছেনঃ
মুই আলাওল হীন          দৈববশ অনুদিন
বিধি বিড়ম্বিল বৃদ্ধকাল।
শ্রীমন্ত সোলেমানের অনুরোধে রচিত এ গ্রন্থটি ইসলাম ধর্মের তত্ত্বোপদেশপূর্ণ। কাব্যাকারে রচিত হলেও মূলত ধর্মীয় নীতি কথাই এতে প্রাধান্য পেয়েছে। পঁয়তাল্লিশ অধ্যায়ে বিভক্ত এ কাব্যে বর্ণিত হয়েছে মুসলমানদের ধর্ম-আচার-আচরণ কর্তব্য ইত্যাদি বিষয়।
এরপর তিনি রচনা করেন নিজামী গঞ্জভীর ফারসি ‘সেকান্দর নামা’ অনুবাদের মাধ্যমে ‘সেকান্দর নামা’ কাব্যটি। এটি তার ষষ্ঠ গ্রন্থ। আরাকানরাজ চন্দ্র সুধর্মার নবরাজ উপাধিধারী মজলিস নামক জনৈক অমাত্যের ইচ্ছায় এটি রচিত হয়। সম্ভবত ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে কবির অতি বৃদ্ধ বয়সের রচনা এটি। কবি তখন শোকতাপ ও অর্থকষ্টে বিপর্যস্ত। সেকান্দর বা আলেকজান্ডারের দিগি¦জয় এ কাব্যের মূল কাহিনী। আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপ, শিক্ষাগুরু ও মন্ত্রী আরস্ততালিশ (আরিস্টটল), পারস্যরাজ দারা বা দরায়ুস প্রভৃতির কাহিনী এ কাব্যে বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া একজন সঙ্গীতবিদ হিসেবে তিনি সঙ্গীত শিক্ষাদানের প্রয়োজনের তাগিদে রচনা করেন রাগতালের ধ্যান ও ব্যাখ্যা। এসময় তিনি কতিপয় গানও রচনা করেন। এগুলো তার মৌলিক রচনা। এ ছাড়া তিনি বাংলা ও ব্রজবুলিতে বৈষ্ণব পদও রচনা করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায় কবি আলাওলের কাব্য সাধনা ছিল মূলত অনুবাদমূলক। তবে অনুবাদে তিনি মূলের হুবহু অনুনরণ কিংবা আক্ষরিক অনুবাদ করেন নি। করেছেন ভাবানুবাদ। প্রয়োজন মতো তাতে তিনি সংযোজন ও বর্জন করেছেন দক্ষতার সাথে। তাই তার অনুবাদেও মৌলিক রচনার অহংকারের স্ফূরণ ঘটেছে। তার কাব্যসমূহের পর্যালোচনা ও পণ্ডিতদের মতামতের ভিত্তিতে বলা যায় কি জ্ঞানের প্রাচুর্যে, কি ভাষা জ্ঞানের দক্ষতায়, কি শব্দ সম্ভারের ব্যাপকতায়, কি শিল্পকুশলতায় সমৃদ্ধ আলাওলের রচনা সম্ভার তার শ্রেষ্ঠত্বেরই পরিচয় বহন করে। সুতরাং বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে কবিকূলের ‘শিরোমণি আলাওল।’


 
এ পর্যন্ত সর্বাধিক পঠিত

  ইনফোটেক : ইন্টারনেট নিয়ে গ্রাহক প্রতারণা!
  প্রবাস : চিতোর, ইতিহাসের তিন নারী
  অনুসন্ধান : কয়টি সিম রাখা যাবে?
  পোস্টমর্টেম : নকল ডিমে রাজধানী সয়লাব
  সাহিত্য : নাথ সাহিত্যের স্বরূপ
  আন্তর্জাতিক : যেভাবে যৌনদাসীদের ভোগ করছে আইএস জঙ্গিরা
  অর্থনীতি : মূল বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশজাতীয় বেতন কমিশনের রিপোর্টে যা আছে
  সমকালীন : বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কূটনীতির দৃষ্টিতে মোদীর ঢাকা সফর
  প্রশাসন : চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল হচ্ছে!
  ফিচার : জিগোলো! রমরমা এক ব্যবসা
  বিশেষ প্রতিবেদন : ক্যাপ্টাগন: জঙ্গিদের টেরোরিস্ট ড্রাগ!
  সাহিত্য : শিরোমণি আলাওল
  চমক! : জমজমের পানি নিয়ে জাপানী বিজ্ঞানীদের রহস্য আবিষ্কার!
  আন্তর্জাতিক : ভয়ঙ্কর আইএস-এর উত্থান ও নৃশংসতা!
  সাহিত্য : মগের মুল্লুকে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ
 





free counters



উপদেষ্টা সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল-হারুন   |  সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ জিয়াউল হক   |  প্রধান সম্পাদক : আসিফ হাসান

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: দেওয়ান কমপ্লেক্স, ৬০/ই/১ (৭ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: +৮৮-০২-৯৫৬৬৯৮৭, ০১৯১৪ ৮৭৫৬৪০  |  ফ্যাক্স: +৮৮-০২-৯৫৬৬৩৯৮

ইমেইল: editor@weeklymanchitra.com, manchitra.bd@gmail.com
©  |  Amader Manchitra

Developed by   |  AminMehedi@gmail.com