আমাদের মানচিত্র  |  বর্ষ: ১, সংখ্যা: ৩৯     ঢাকা, বাংলাদেশ  |  আজ সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮  |  




আর্কাইভ সংখ্যা - নির্বাচন হচ্ছে তবে...

আর্কাইভ সংখ্যার প্রচ্ছদ



বর্ষ: ১, সংখ্যা: ৩৯
রবিবার, ৫ জানুয়ারী ২০১৪




 
একনজরে এই সংখ্যা -

  প্রচ্ছদ প্রতিবেদন : নির্বাচন! অতপর......
  সম্পাদকীয় : সংসদ নির্বাচন ও আমাদের প্রত্যাশা
  সাহিত্য : শিরোমণি আলাওল
  অনুসন্ধান : ডাবল ভ্যাটের ফাঁদে সুপারশপের ক্রেতারা
  ফিচার : গাইড
  যাপিত জীবন : স দা চা র শি ক্ষা
  প্রতিবেদন : দুঃসময়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প!ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে
  স্মরণ : নেলসন ম্যান্ডেলা মাদিবা: কাছে থেকে দেখার কিছু সুখস্মৃতি
  রাজনীতি : রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা, প্রধানমন্ত্রীর চোখে সমৃদ্ধির স্বপ্ন
  বিশ্লেষণ : নির্বাচন বর্জনে তারেকের ভিডিও ও সিনিয়র নেতাদের ভূমিকায় খালেদার সন্দেহ!
  ইনফোটেক : বায়োপ্লাস্টিক: আগামীদিনের খাবার
  সমকালীন : ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে
  প্রতিবেদন : আগামি সংসদে যেতে চানহত্যা মামলার আসামি ১২, ব্যবসায়ী ৫২, এসএসসি’র নিচে ১৭ ভাগ প্রার্থী
  কলাম : হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ...
  ভ্রমণ : সাজেক-এ একদিন
  বিশেষ প্রতিবেদন : ভারত-মার্কিন বন্ধুত্বের জটিলতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ইস্যু দেবযানী
  সম্পাদকীয় : বিএনপি’র রাজনৈতিক ভুল ও দশম সংসদের যাত্রা শুরু
 



অনুসন্ধান পড়া হয়েছে ৪৭০ বার

ডাবল ভ্যাটের ফাঁদে সুপারশপের ক্রেতারা

মোঃ নূর নবী

রফিক হাসান, পেশায় একজন প্রকৌশলী। থাকেন সেগুনবাগিচায়। গত সপ্তাহে একদিন সকালে গেলেন পল্টনের ‘স্বপ্ন’ আউটলেটে। উদ্দেশ্য একটি লাইফবয় হ্যান্ডওয়াশ কিনবেন। ভেতরে ঢুকে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সেটি নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে দাম চুকাতে গিয়ে দেখলেন তারকাছে বিল দেয়া হয়েছে ৫৭ টাকা ২০ পয়সা। হ্যান্ডওয়াশের গয়ে লেখা ৫৫ টাকা। ভ্রু কুঁচকে সেলস্যমানের কাছে জানতে চাইলে বললেন স্যার বাকি ২ টাকা ২০ পয়সা হচ্ছে মোট মূল্যের উপর ৪% ভ্যাট। এর আগের মাসে  রফিক হাসান পাড়ার একটি খুচরা দোকানে যখন এই হ্যান্ডওয়াশ কিনতে যান তখন দোকানি তারকাছে দাম রেখেছিল ৫৩ টাকা। অথচ গায়ে লেখা ছিল ৫৫ টাকা। দোকানিকে কেন ২ টাকা কম রাখছেন জিজ্ঞেস করতে দোকানি বললেন, স্যার আমরাতো এমনিতে কিছু কমিশন পাই, সেখান থেকে আপনাকে কিছু ছাড় দিলাম। ‘স্বপ্ন’ আউটলেটে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখে রফিক সাহেব প্রতিবাদ করে বললেন, ভ্যাটতো মূল্য যখন নির্ধারিত হয় তখনই ধরে করা হয়। আবার ভ্যাট কেন? সেলসম্যান কোন জবাব দিতে পারলেন না। বিরক্তি নিয়ে ১০০ টাকার একটি নোট ক্যাশ কাউন্টারে দিতেই ফেরত দেয়া হল ৪২ টাকা। রফিক সাহেব আরো পান ৮০ পয়সা। বাকি পয়সা কোথায়-ক্যাশের ছোকরাটিকে জিজ্ঞেস করতেই হাতে ধরিয়ে দিল একটি চকলেট। বললো, স্যার, খুচরা পয়সা নেইতো তাই চকলেটটি নিয়ে যান।
দেশের বিভিন্ন সুপারশপগুলোর এই হলো নিত্যদিনের চিত্র। এ নিয়ে দিন দিন ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ জমা হলেও কোন প্রতিকার হচ্ছে না। সাধারাণত মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তদের কোনকাটার একটি সহজ মাধ্যম হচ্ছে এই সুপারশপগুলো। কারণ এখানে একসাথে একই স্থানে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো পাওয়া যায়। কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটাও করা যায় বলে এর জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। কিন্ত একে পুঁজি করে এই সুপারশপগুলোতে একধরনের অনৈতিক বাণিজ্যও দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সুপারশপের ম্যানেজার বললেন, ডাবল ভ্যাটের বিষয়টি নিয়ে তারাও চিন্তিত। কারণ এতে তাদের গ্রাহক কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সুপারশপ মালিকদের সংগঠন এনবিআররের সাথে কথাও বলেছে। কিন্তু কোন প্রতিকার হয় নি। 
অভিযোগ রয়েছে, এভাবেই সাধারণ ভোক্তার কাছ থেকে একই পণ্যে দুই দফা ভ্যাট আদায় করছে দেশের সুপারশপগুলো। যার এক দফা যাচ্ছে সরাসরি মালিকদের পকেটে। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন-২০১২ লঙ্ঘন করে ভোক্তার কাছ থেকে এই অর্থ নিচ্ছে নামিদামি সবক’টি সুপারশপ। রাজস্ব বিভাগের বিষয়টি জানা থাকলেও ঠেকাতে পারছে না। এর মধ্যদিয়ে সাধারণ ক্রেতাকে ঠকিয়ে বছরে ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। 
দেশি পণ্য বিক্রিতে সুপারশপগুলো এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। রাজধানীর প্রথমসারির আগোরা, মিনাবাজারসহ প্রায় সবক’টি সুপারশপ সরেজমিন ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে। পণ্যের নির্ধারিত খুচরা মূল্যের ওপর ভ্যাটের নামে আরও ৪শতাংশ ক্রেতার পকেট থেকে তুলে নিয়ে সরাসরি নিজেদের পকেটস্থ করছেন সুপারশপ মালিকেরা। ‘বিএসটিআই নির্ধারিত খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা যাবে না’, এমন আইন ও ভোক্তা অধিকার দুইয়ের প্রতিই বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাচ্ছেন এসব শপের মালিকপক্ষ। প্রতিটি পণ্যের খুচরা মূল্যের মধ্যেই রাজস্ব বিভাগের জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট অন্তর্ভূক্ত থাকে। এক্ষেত্রে  ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করে সুপারশপগুলোর তাদের পণ্য বিক্রি করার কথা। অথচ ২০১২ সালের ভ্যাট আইন অনুযায়ী সুপারশপগুলো ৪ শতাংশ হারে এনবিআরকে ভ্যাট দেওয়ার কথা। আর তা ধরা থাকবে কোন পণ্যের সর্বোচ্চ বিক্রয় মূল্যের মধ্যেই।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, একটি দুই লিটারেরের কোমল পানীয়র নির্ধারিত খুচরা দাম ৮০ টাকা। সাধারণ দোকানগুলো থেকে ক্রেতা তা ৮০ টাকায়ই কিনছে। কিন্তু সুপারশপে গেলেই কিনতে হচ্ছে ৮৩.২০ টাকায়। ভ্যাটের নামে অতিরিক্ত ৩ দশমিক ২০ টাকা আদায় করছে তারা।
রাজধানীর একটি সুপারশপে দিনে গড়ে দুই হাজার ক্রেতা জনপ্রতি ৮০০ টাকার বাজার করেন। এই সুপারশপের ১৮টি চেইন শপ রয়েছে। পণ্যে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ভ্যাটে এই শপটিই বছরে তুলে নেয় ৪০ কোটি টাকার বেশি। অন্য বড় বড় সুপারশপগুলো মিলিয়ে এ ব্যবস্থায় বছরে ১০০ কোটি টাকারও বেশি আয় হয়। বিষয়টি এনবিআর কর্তৃপক্ষের জানা নেই, তা কিন্তু নয়। জনবল সঙ্কটের দোহাই দিয়ে আইনের এই চরম লঙ্ঘন সহ্য করে যাচ্ছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর আগোরা, মিনাবাজারসহ আরও কয়েকটি সুপারশপে এই অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। পণ্য ক্রয়ে কেন এই অতিরিক্ত অর্থ গ্রাহকের পকেট থেকে নেয়া হবে?- একটি অনলাইন সংবাদসংস্থার এমন প্রশ্নের জবাবে মিনাবাজার সুপারশপের প্রধান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা শাহিন খান জানান, এনবিআর-এর দেয়া নীতিমালা অনুযায়ীই তারা এই অতিরিক্ত ভ্যাট আদায় করছেন। তিনি দাবি করেন, নীতিমালার মধ্যে থেকেই আমরা গ্রাহক থেকে ভ্যাট নিচ্ছি এবং এনবিআরের কোষাগারে জমা দিচ্ছি। নীতিমালায় গ্রাহক থেকে ভ্যাট নেয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে  সংবাদ সংস্থাটির কাছে ভ্যাট নিয়ে মিনা বাজারের দেওয়া ব্যাখ্যা ‘পুরোপুরি  মিথ্যা’ বলে দাবি করেন এনবিআর-এর প্রথম সচিব (ভ্যাট) আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, ‘দু’বার ভ্যাট নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। সুপারশপগুলো যা বলছে তা পুরোপুরি ভুল ব্যাখ্যা।’
আব্দুর রউফ বলেন, ‘দেশি পণ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ধরেই পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণ করা হয়। ভ্যাট আইনে ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের কথা বলা হলেও গ্রাহক থেকে অতিরিক্ত হারে টাকা আদায়ের কোনো কথা বলা হয়নি। এমআরপির ভেতরে ভ্যাটের টাকা সমন্বয় করে ওই পণ্য বিক্রি করতে হবে। অতিরিক্ত টাকা নেয়া যাবে না।’ আব্দুর রউফের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১০০ টাকা মূল্যের একটি পণ্যের সাথে ১৫ টাকা ভ্যাট যোগ করে পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ১১৫ টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি করা যাবে না।
যদি সুপারশপগুলো ভ্যাট নিতে চায় তাহলে ওই পণ্যের মূল্য ১শ ১১ টাকা নির্ধারণ করে ৪ টাকা ভ্যাট আদায় করতে পারবে তবে কোনভাবেই পণ্যের মূল্য ১শ ১৫ টাকার বেশি নেয়া যাবে না, বলেন আব্দুর রউফ। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে, সুপারশগুলো আরও একদফা ভ্যাট যোগ করে ১শ ১৫ টাকার পণ্য ১শ ১৯ দশমিক ৫ টাকায় বিক্রি করছে। এ নিয়ে ফের সুপারশপে যোগাযোগ করা হলে, এনবিআরের ব্যাখ্যা মানতে নারাজ তারা। শাহিন খান বলেন, ‘এনবিআরের কর্মকর্তারা শুধু এরকম ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তবে এব্যাপারে কখনো লিখিত দিতে রাজি হবেন না তারা।’
বার্ষিক টার্নওভারের উপর সুপারশপগুলো দশমিক ৫ শতাংশ কর দিচ্ছে, আর এই ৪ শতাংশ হচ্ছে বিক্রয় সংশ্লিষ্ট ভ্যাট। এটা ক্রেতা থেকেই নিতে হবে, দাবি শাহীন খানের।
এদিকে, কৃষিপণ্য ভ্যাটমুক্ত আর প্রক্রিয়াজাত সব পণ্য ভ্যাট পরিশোধিত হওয়ায় পরও সরেজমিন মিনা বাজারের মগবাজারের ও আগোরার ধানমন্ডি শাখায় গিয়ে ৪ শতাংশ ভ্যাটের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রমাণ মিলেছে। তেল, দুধ, বিস্কুট থেকে শুরু করে পানীয় পর্যন্ত সব পণ্যে ভ্যাট নেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকরা বলছেন, ভ্যাটের কারণে ৮০ টাকার কোকা-কোলা ৮৩ দশমিক ২০ টাকা, ৯০ টাকার দুই লিটার মিরিন্ডা ৯৩ দশমিক ৬ টাকা, ৫৮ টাকার এক লিটার আড়ং দুধের প্যাকেট ৬০ দশমিক ৩ টাকা, ১শ ৯০ টাকার ইগলু আইসক্রিম কন্টেইনার ১শ ৯৭ দশমিক ৬ টাকা আদায় করছে। এক ক্রেতা সংবাদ মাধ্যমটির কাছে অভিযোগ করেন, সুপারশপগুলো ইচ্ছে করেই নিজেদের ভ্যাট ক্রেতাদের ঘাড়ে চাপাচ্ছে। তা না হলে একজন মানুষ একই পণ্যে কেন দুইবার ভ্যাট দেবে? এনবিআর সব কিছু জেনে কেন চুপ করে বসে আছে? প্রশ্ন ক্রেতার। 
এনবিআরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ভ্যাট নিয়ে আইনের লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এরপরেও কেন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না এনবিআর? এমন প্রশ্নে এনবিআর সচিব আব্দুর রউফ জনবলের ঘাটতির কথাটিই তুলে ধরেন বার বার। 
তিনি বলেন, ‘আমরা ভ্যাটের এই বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তবে সীমিত জনবল আর কাঠামোগত অসুবিধার কারণে শতভাগ পর্যবেক্ষণ এখনই সম্ভব হচ্ছে না।’
ক্রেতারা সুপারশপগুলো আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে নিজেদের ভ্যাট সাধারণ গ্রাহকদের কাধে তুলে দিচ্ছে বলে মত দিয়ে প্রয়োজনে আইন সংশোধনের দাবি করেন। এছাড়াও সুপারশপের অবকাঠামোগত সমস্যা দুর করে যে সব পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে দ্বৈত ভ্যাটনীতি প্রয়োগ হচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করে অসঙ্গতি দুর করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন ক্রেতা ও সংশ্লিষ্টরা।
‘ফাও কামাই’
এছাড়া গ্রাহককে খুচরা পয়সা না দিয়ে বছরে প্রায় ২ কোটি টাকা ‘অবৈধ’ পথে আয় করছে দেশের সুপারশপগুলো। বিপুল গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া এই টাকা পকেটস্থ করছেন শপ-মালিকরা। আর বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনেও নিচ্ছেন গ্রাহক। মেশিনে নির্ভুল হিসাবের নামেই গ্রাহকের পকেট কাটছে সুপারশপগুলো।  
সুপারশপগুলোতে দেখা যায় গ্রাহকের পণ্যমূল্য শতকরা ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রেই খুচরো পয়সায় চলে যাচ্ছে। আর মেশিন যখনই খুচরা পয়সা দেখাচ্ছে বিক্রয়কর্মী তা পুরো টাকায় হিসাব করে গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি আদায় করছেন। ক্রেতাদের অভিযোগ, সুপারশপগুলোর এই আচরণ অসততার সামিল। তাদের মতে, সাধারণ মুদি দোকানে হিসাবটি থাকে পুরো টাকার। কেবল সুপারশপেই মেশিনের হিসাবে খুচরা পয়সা দেখা যায়। সেক্ষেত্রে ৯৯.২০ টাকার বাজার করে ক্রেতা ১০০টাকা দিচ্ছেন। ‘সামান্য ৮০ পয়সা’র জন্য ক্রেতা কোনো কথা বলছেন না। কিন্তু তা থেকে বছর শেষে কোটি টাকা বানিয়ে নিচ্ছেন সুপারশপ মালিকরা।
দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত জেমকন গ্র“পের সুপারশপ মিনাবাজার ও রহিম আফরোজের আগোরাসহ রিটেইল চেইন স্বপ্ন, আলমাস, নন্দন মেগাশপ, মোস্তফা মার্ট, মেহেদী মার্টসহ বিভিন্ন সুপারশপের আউটলেটগুলোতে ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।
এক্ষেত্রে বিক্রেতারা একটাই অজুহাত দেখাচ্ছেন। আর তা খুচরা পয়সা না থাকার অজুহাত।
সুপারশপগুলোর বিক্রেতাদের দাবি, যদি পণ্যমূল্য টাকার অংক ছাড়িয়ে পয়সায় গড়ায় এবং তা ৫০ পয়সার নিচে হয় তাহলে ক্রেতার কাছ থেকে কম নেওয়া হয়। আর যদি ৫০ পয়সার ওপরে চলে যায় তাহলে বিক্রেতা পুরো টাকাটি নিয়ে নেবে।
একথা বাংলানিউজকে বলেছেন আগোরার মার্কেটিং ম্যানেজার আশরাফুল হাসান। অন্য সুপারশপগুলোর কর্তৃপক্ষেরও একই দাবি।
কিন্তু সরেজমিন গিয়ে তাদের কথার সাথে মিল পাওয়া যায় নি বাস্তবে।  মিনাবাজারের ক্রেতা শাহনাজ নূর বাংলানিউজকে জানান, তিনি মিনাবাজার থেকে ৮০ টাকার পণ্য কিনে ভ্যাটসহ ৮৩ টাকা ২০ পয়সার বিল হাতে পান। এবং তার কাছ থেকে আদায় করা হয় ৮৪ টাকা। (মেমো নং.আইএনভি/৮৪২৫৬৭/পিওএস৩২০৯১২)।
নাসরিন বেগম নামে অপর এক ক্রেতা একই অভিযোগ করেন। তিনি জানান, প্রতিবার ১০ বা ২০ পয়সার জন্য তার কাছ থেকে পুরো টাকা নেওয়া হয়েছে। নাসরিন বলেন, দুই-একবার ক্যাশিয়ারকে বলার চেষ্টা করেছি। তারা কোনো উত্তর দেন না। এজন্য তো আর ঝগড়া করা যায় না।
মিনাবাজারের মগবাজার আউটলেট থেকে একজন ক্রেতার মোট বিল ৫০৪.৪০ টাকার বিপরীতে ৫০৫ টাকা আদায় করতে দেখা যায়। (মেমো নং.আইএনভি/৮৩৫৪৮৮/পিওএস৩২০৯১১)।
রেজাউন নাহার নামে এক ক্রেতা জানান, তিনি আগোরার ধানমি  আউটলেট থেকে ৬৯ দশমিক ৬৮ পয়সা দিয়ে একটি কিশান চকলেট বিস্কুটের প্যাকেট কেনেন। তবে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩২ পয়সাসহ ৭০ টাকা রাখা হয়েছে। (ট্রানসেক-১০৪০৪৭)
প্রতিবারই সুপারশপগুলোএরকম করে খুচরা পয়সা আদায় করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কম নিতে দেখা যায় না কখনোই। বেশিই আদায় করে নেয়। এটা শপগুলোর ‘ফাও কামাই’, বলেন এই ক্রেতা। এদিকে, ক্রেতা থেকে খুচরা পয়সা আদায়ের এই চর্চাকে ব্যবসানীতিরই অংশ বলেই দাবি করেছে সুপারশপ মালিক পক্ষ।
আগোরার মার্কেটিং ম্যানেজার আশরাফুল হাসান বলেন, সুপারশপের মালিকরা একমত হয়ে বাজারের বিলে ৫০ পয়সা কিংবা তার বেশি হলে ১ টাকা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ৫০ পয়সার নিচে বিল হলে তা গ্রাহকের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। তার মতে, ‘এতে প্রতিমাসে ১৫ থেকে ২০ টাকা এদিক সেদিক হয়।’
মিনাবাজারের প্রধান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা শাহিন খান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২৫ আর ৫০ পয়সা সরবরাহ না থাকায় সুপারশপগুলোতে এরকম সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে শাহীন খান এমন ঘটনাকে অপারেটরের ‘নিছক ভুল’ বলে দাবি করে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন।
একই ধরণের ‘ভুল’ নিয়মিত করে ইন্টারন্যাশনাল চেইন মোস্তফা মার্ট। সরেজমিন মোস্তফা মার্টে গিয়ে দেখা গেছে, ৮৫ টাকা মূল্যের একটি ক্লোজআপ পিপারমেন্ট টুথপেস্টের দাম ৩.৪৬ টাকা ‘ভ্যট’সহ ৯০ টাকা নেয়া হচ্ছে। ৫৪ পয়সা সমন্বয় করে ১ টাকা খুচরা দেওয়া যাবে না বলে পুরো ১ টাকা ৫৪ পয়সা বেশি নিচ্ছে তারা। (বিল-সিএ১৩-১৭৬২২১) অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কারণ জানতে চাইলে কথা বলার মতো কেউ অফিসে নেই বলে জানান মোস্তফা মার্টের বিক্রেতারা।
সুপারশপগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে রিটেইল চেইন মিনাবাজার, আগোরা, আলমাস, নন্দন, স্বপ্ন, মেহেদী ও মোস্তফা মার্টের সবমিলিয়ে ছোট বড় মিলে দুই শতাধিক আউটলেট রয়েছে। এসব আউটলেটে প্রতিদিন ক্রেতার সংখ্যা চারশ’ থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত ওঠানামা করে। গড়ে দিনে একটি আউটলেটে ৭০০ ক্রেতা হলে এক লাখ ৪০ হাজার ক্রেতা কেনাকাটা করেন। যাদের কাছ থেকে  প্রতিটি লেনদেনে কমপক্ষে ৪০ পয়সা করে নিলেও দিনের আয় দাঁড়ায় ৫৬ হাজার টাকা। আর বছরে তা ২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অবৈধ এই টাকা আয় হিসেবে না থাকায় আয়করও দিতে হয় না।
শুধু খুচরা পয়সার বাণিজ্য নয়! এরসাথে বাধ্যতামূলক লজেন্স-ক্যান্ডি বিক্রি থেকেও ফায়দা লুটছে  সুপারশপগুলো।  খুচরা পয়সাতো দুরের কথা গ্রাহকের বিলের সাথে দুই বা তিন টাকা পাওনা থাকলে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে  অ্যালপেনলিবে, কফিকো, মিস্টার ম্যাঙ্গো, লিচিজ এর লজেন্স কিংবা ক্যান্ডি।
একজন ক্ষুব্ধ ক্রেতা বলেন, লাভের উপর দ্বিগুণ লাভ। লেনদেনে খুচরা পয়সাতো নিয়েই নিচ্ছে, তার উপর ২-৩ টাকা না দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে লজেন্স। তা ক্রেতা চান কি না চান। অধিকাংশ সুপারশপই দিনে দেড় থেকে দু’হাজার লজেন্স দিয়ে দিচ্ছে খুচরা টাকার পরিবর্তে। এতেও চলছে লাখ লাখ টাকার বিক্রয় ও মুনাফা। এ বিষয়ে একজন ক্রেতা বললেন, বিষয়টি অতিরিক্ত পয়সা আদায়ের নয়। বরং বিষয়টি বিবেক দিয়ে ভাবার।
দিনে শত শত সুপারশপের আউটলেটে আমার মত হাজার-হাজার ক্রেতা থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছে, তবুও গ্রাহকের জন্য এক পয়সা ছাড় দিতে রাজি নয় তারা। তিনি বলেন, যাদের ইউরোপ আমেরিকায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তারা জানেন, যেকোনো দোকানে খুচরা পেনি, স্টার্লিং পাওয়া যায়। আর সেগুলো গ্রাহকের কাজেও লাগে। গাড়ি পার্কিং, লন্ড্রিসহ বিভিন্ন কাজেও লাগে এই খুচরা কয়েন। তার ভাষায়, বাজার থেকে ফেরা খুচরা পয়সা জমিয়ে রাখা অনেকেরই অভ্যাস। এবং সেই জমানো পয়সা এক সময় হাজার টাকায়ও দাঁড়ায়। বিশেষ করে নারীদের এগুলো জমানোর অভ্যাস চিরাচরিত।
কিন্তু সুপারশপগুলো সেই সুযোগ কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক ক্যান্ডি খাওয়াছে, বলেন ক্ষুব্ধ একজন ক্রেতা। সুপারশপের এসব কার্যকলাপের ক্ষেত্রে দেশে সুনির্দিষ্ট আইন কিংবা বিধান না থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছে তারা।
আগোরার মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ আশরাফুল হাসান বলেন, এই ভ্যাট ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে এনবিআর। আমাদের অনিচ্ছা থাকা সত্বেও আমরা ক্রেতা থেকে ভ্যাটের অতিরিক্ত টাকা নিতে বাধ্য হই।
আইনের সঙ্গে সাঙ্ঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও কেন এসব সুপারশপের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না- এমন প্রশ্নের উত্তরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, এ বিষয়ে কোনো ভোক্তার কাছ থেকে আমরা এখনো কোনো লিখিত কিংবা মৌখিক অভিযোগ পাইনি।
যদি ‘সত্যিই’ সুপারশপগুলো সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি টাকা আদায় করে, তাহলে প্রমাণসহ ক্রেতার অভিযোগপত্র গ্রহণের পর তদন্তসাপেক্ষে সুপারশপের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পরবর্তীতে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে যথাযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
গ্রাহককে প্রতি ‘পদে পদে ঠকানো’ সুপারশপগুলোর আরেকটি ফাঁদ হচ্ছে কৃষিপণ্য। হাঁসের ডিমের হালি পঞ্চাশ টাকা থেকে শুরু করে কাঁচামরিচ-লেবু পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যের অতিরিক্ত দাম আদায় করা হচ্ছে, যার হিসেব নেওয়ার মতো কেউ নেই।
অতিরিক্ত মূল্য ধার্যের কথা স্বীকার করেন মিনাবাজারের প্রধান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা শাহিন খান। তবে এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমাদের উন্নত রেফ্রিজারেশন সিস্টেম পণ্যের গুনাগুণ দীর্ঘ সময়ের জন্য অটুট রাখে। আর এই রেফ্রিজারেটর আমদানি করতে ৬৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। তাই কৃষিপণ্যের দাম বাজারের চেয়ে একটু বেশি। তবে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে এসব পণ্যের দাম প্রতিদিন হালনাগাদ করা হয়।
কৃষিপণ্যে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ব্যপারে মোঃ আবুল হোসেন মিয়া বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতা শুধুমাত্র প্যাকেটজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই খোলা কৃষিপণ্যের দাম আদায়ে আইনের কোনো বাধা নেই।
ডাবল ভ্যাট, খুচরা পয়সা, আর প্রতিটি পণ্যে অতিরিক্ত টাকায় শত শত কোটি আয় করলেও ক্ষান্ত হচ্ছে না দেশের সুপারশপগুলো। প্রায়ই ক্রেতাদের কাছ থেকে কৌশলে বা ‘ভুলে’ অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রমাণ মিলেছে বিভিন্ন অভিযোগে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, ইসিআর মেশিনে সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এটা নিশ্চিত এই অনিয়মের সাথে সুপারশপের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও দায়ী।
ক্রেতাদের অভিযোগের বিষয়ে একই কথা বলেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ আবুল হোসেন মিয়া। তিনি বলেন, প্রমাণসহ অভিযোগ থাকলে আমরা সুপারশপের কাছে ব্যাখ্যা চাইবো। সুপারশপের এসব কাজকর্মের বিরুদ্ধে দেশে কোনো আইন কিংবা বিধান না থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছে তারা। তবে ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজের জন্য আপনার অভিযোগ পাঠান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি লিখে অথবা অনলাইনে নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে যেকোন ভুক্তভোগী অভিযোগ দিতে পারেন। অনলাইনে অভিযোগ করার ই-মেইল ঠিকানা: http://www.dncrp.gov.bd/contactform.php n
তথ্যসূত্র: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরডটকম 


 
এ পর্যন্ত সর্বাধিক পঠিত

  ইনফোটেক : ইন্টারনেট নিয়ে গ্রাহক প্রতারণা!
  প্রবাস : চিতোর, ইতিহাসের তিন নারী
  অনুসন্ধান : কয়টি সিম রাখা যাবে?
  পোস্টমর্টেম : নকল ডিমে রাজধানী সয়লাব
  সাহিত্য : নাথ সাহিত্যের স্বরূপ
  আন্তর্জাতিক : যেভাবে যৌনদাসীদের ভোগ করছে আইএস জঙ্গিরা
  অর্থনীতি : মূল বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশজাতীয় বেতন কমিশনের রিপোর্টে যা আছে
  সমকালীন : বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কূটনীতির দৃষ্টিতে মোদীর ঢাকা সফর
  প্রশাসন : চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল হচ্ছে!
  ফিচার : জিগোলো! রমরমা এক ব্যবসা
  বিশেষ প্রতিবেদন : ক্যাপ্টাগন: জঙ্গিদের টেরোরিস্ট ড্রাগ!
  সাহিত্য : শিরোমণি আলাওল
  চমক! : জমজমের পানি নিয়ে জাপানী বিজ্ঞানীদের রহস্য আবিষ্কার!
  আন্তর্জাতিক : ভয়ঙ্কর আইএস-এর উত্থান ও নৃশংসতা!
  সাহিত্য : মগের মুল্লুকে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ
 





free counters



উপদেষ্টা সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল-হারুন   |  সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ জিয়াউল হক   |  প্রধান সম্পাদক : আসিফ হাসান

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: দেওয়ান কমপ্লেক্স, ৬০/ই/১ (৭ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: +৮৮-০২-৯৫৬৬৯৮৭, ০১৯১৪ ৮৭৫৬৪০  |  ফ্যাক্স: +৮৮-০২-৯৫৬৬৩৯৮

ইমেইল: editor@weeklymanchitra.com, manchitra.bd@gmail.com
©  |  Amader Manchitra

Developed by   |  AminMehedi@gmail.com