আমাদের মানচিত্র  |  বর্ষ: ৪, সংখ্যা: ২৮     ঢাকা, বাংলাদেশ  |  আজ বূধবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭  |  




আর্কাইভ সংখ্যা - বিএনপি’র দুর্বলতা ও রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা!

আর্কাইভ সংখ্যার প্রচ্ছদ



বর্ষ: ৪, সংখ্যা: ২৮
রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬




 
একনজরে এই সংখ্যা -

  সম্পাদকীয় : পবিত্র ঈদুল আজহা ও ত্যাগের পরীক্ষা
  প্রবাস : জন্ম ও মৃত্যু নিয়ে এলিজাবেথ কুবলার রস
  বিশেষ প্রতিবেদন : অর্থের জোরও ঠেকাতে পারেনি মীর কাসেম আলীর ফাঁসি
  ফিচার : রূপকথার এক প্রেমকাহিনী!
  অনুসন্ধান : পিলার চুরি ও বজ্রপাতে প্রাণহানির নেপথ্যে...
  পোস্টমর্টেম : ফারাক্কা নিয়ে নীতিশের প্রস্তাব ও প্রকৃতির প্রতিশোধ!
  স্মরণ : ঢাকায় থাকেন সিরাজ উদ-দৌলার বংশধর!
  ইনফোটেক : স্মার্ট কার্ড: যেভাবে পাবেন
  স্মৃতিচারণ : আঠারোটি বুলেট ও রক্তস্নাত বাংলাদেশ
  প্রতিবেদন : দুই জোটের অর্ধেক রাজনৈতিক দলেরই নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই
  অর্থনীতি : গ্যাসের মূল্য: আবার বাড়ছে কার স্বার্থে?
  প্রচ্ছদ প্রতিবেদন : বিএনপি’র দুর্বলতা ও রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা!
  ধর্ম : জরথ্রুস্টঃ ইরানের প্রাচীন ধর্ম
  বিশেষ প্রতিবেদন : জঙ্গি দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স!
  রাজনীতি : দুই ডজনেরও বেশি নেতা বিএনপিকে বিদায় জানাচ্ছেন!
  কলাম : জেলা, মহকুমা ও উপজেলার ইতিবৃত্ত
  দুর্নীতি প্রতিবেদন : মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা?
  চমক! : ফেরাউন ও মূসা
 



প্রচ্ছদ প্রতিবেদন পড়া হয়েছে ২২৩ বার

বিএনপি’র দুর্বলতা ও

রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা!

হারেছ আহমেদ হারুন

গত ১ সেপ্টেম্বর ঊনচলি­শ বছরে পা রাখলো দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় জন্ম নেওয়া এ দলটি আজ নানা সংকটের আবর্তে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী আজ বিচারের মুখোমুখি। দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের বেশ কিছুদিন পর কমিটি ঘোষণা হলেও নানা দুর্বলতায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দলটি। কাঁচা হাতে করা কমিটি গঠনে হয়েছে নানা বিশৃঙ্খলা। সারা দেশে পুরো দলই এখন অগোছালো। বিগত ৫ জানুয়ারি সরকারবিরোধী নিষ্ফল আন্দোলনে নেতা-কর্মীরা মামলা-হামলায় কাবু। দীর্ঘ ৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা এ দলের ‘ঢাউস’ কমিটি হলেও নতুন নির্বাচনের আন্দোলনে ফলপ্রসূ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে মনে করেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ দলটি প্রায় ১৫ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি রাজনীতিতেও শক্ত অবস্থানে ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি দৃশ্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে কিভাবে প্রভাবিত করবে?
২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে রাজনীতিতে বিএনপির শক্ত অবস্থান দেখা যাচ্ছেনা বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। ২০১৫ সালের প্রথম দিকে দলটির টানা অবরোধ কর্মসূচী রাজনৈতিক সফলতার মুখ দেখেনি। সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি'র সরব উপস্থিতি নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয?ের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ নজরুল মনে করেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির দুর্বল হয়ে পড়া দেশের সার্বিক রাজনীতিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। তিনি মনে করেন রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির দুর্বল হয়ে পড়া শুধু দলটির জন্য সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সংকট। বিএনপির দুর্বল হয়ে পড়া ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করছে। অধ্যাপক নজরুল বলেন, ‘১৯৯১ সালের পর থেকে একটা ভারসাম্যমূলক দ্বি-দলীয় শাসন ব্যবস্থা দেখে এসেছি। বিএনপি এখন এতো দুর্বল হয়ে গেছে যে এদেশে এখন প্রায় একদলীয় একটা শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়ে গেছে।’
২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি যদি অংশগ্রহণ করতো, তাহলে দলের অবস্থান শক্তিশালী থাকতো কিনা সেটি নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। কেউ-কেউ মনে করেন, নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করেছে। আবার এমন ধারণাও বেশ জোরালো যে নির্বাচন বয়কট করা ছাড়া বিএনপির সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। সম্প্রতি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর দলটিতে নানা অসন্তোষের চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। দলের কোনো কোনো সিনিয়র নেতা প্রকাশ্যে নতুন কমিটিগুলোর সমালোচনা করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতির অধ্যাপক নাসিম আক্তার হোসাইন বলছেন রাজনীতির মাঠে বিএনপি নীরব হলেও তাদের জনসমর্থনে ভাটা পড়েনি। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো যে দুর্বল হয়ে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই বলে মনে করেন এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
অধ্যাপক নাসিম আক্তার হোসাইন বলেন, ‘একটি দলের সাংগঠনিক কাঠামো বিপর্যয় হলেই সে দলটি যে ভিত্তিহীন হয়ে পড়বে সেটি বলার মতো কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি কেনো দুর্বল হয়ে পড়লো সেটি নিয়ে নানা ধরনের মূল্যায়ন আছে। কেউ মনে করেন, বিগত বছরগুলোতে বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল ছিল।
আবার অনেকে মনে করেন, সরকারের দমন-পীড়ন ও মামলার কারণে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সক্রিয় হচ্ছেন না। আবার অনেকে ভাবছেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় বাইরে থাকার কারণে নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা রয়েছে। বিএনপির শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে পরিচিত এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল­াহ মনে করেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি স্তিমিত হয়ে যাবার একটি বড় কারণ হচ্ছে সরকারের 'দমন-পীড়ন।' এমন পরিস্থিতিতে চাইলেও বিএনপির পক্ষে সক্রিয় থাকা সম্ভব নয় বলে উলে­খ করেন অধ্যাপক মাহবুব উল­াহ। তবে একটি বড় রাজনৈতিক দলের নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ার উদাহরণ রয়েছে বলে তিনি উলে­খ করেন। অধ্যাপক মাহবুব উল­াহ বলেন, 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আইয়ুব খানের আমলে আওয়ামী লীগের এ ধরনের অবস্থা হয়েছিল।'
তিনি মনে করেন, একটি দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে সরকারের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা তৈরি হয়। তবে রাজনীতিতে বিএনপির নিষ্ক্রিয় থাকার বিষয়টি শক্তি সঞ্চয়ের একটি কৌশলও হতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। তিনি বলেন, 'আক্রান্ত হয়েছেন, যার ফলে আপনি পিছু হটছেন। এবং পিছু হটে আবার শক্তি সঞ্চয়ে করে যদি কিছু কর যায় ভবিষ্যতে। সেটার জন্য প্রস্তুতি নেয়া'
সমালোচনা রয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছিল এবং সেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর গুরুত্ব বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় উপলব্ধি করতে পারেনি। সেজন্যই বিএনপিকে এখন রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। অধ্যাপক মাহবুব উল­াহ মনে করেন এ ধারণা আংশিক সত্য, পুরোপুরি সত্য নয়। তিনি বলেন, 'একটা দল যখন রাজনীতিতে অসুবিধার মধ্যে পড়ে তখন তার নানা সমালোচনা হয়। আবার যখন একটা দল বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠে তখন কিন্তু আবার আমরা সে ধরনের কথা বলি না।' তবে বিশ্লেষক আসিফ নজরুল মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি 'অনুলে­খ্য' হয়ে যাবার পেছনে প্রধানত দায়ী বিএনপি'র রাজনৈতিক কৌশল। তিনি মনে করেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে দু'টি বড় ভুল করেছে। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জ্যির সাথে সাক্ষাৎ না করা এবং আলোচনার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে টেলিফোন করেছিলেন সেখানে সাড়া না দেয়া। অধ্যাপক নজরুল বলেন, 'বর্তমান রাজনীতি , তরুণ প্রজন্মের মনোভাব এবং আন্তর্জাতিকভাবে রাজনীতির যে মেরুকরণ ঘটছে... আমার কেন যেন মনে হয? ওনারা (বিএনপি) এ পুরো বিষয়গুলো রিয?েলাইজ (অনুধাবন) করতে পারেন না।'
রাজনীতিতে দলের অবস্থানকে বিশ্লেষকরা নানাভাবে মূল্যায়ন করলেও দলটি কী মনে করছে?
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করেন বিএনপি কখনোই দুর্বল হয়নি। সরকারের নানা ধরনের 'দমন-পীড়নের' পরেও বিএনপি শক্তভাবে টিকে আছে বলে উলে­খ করেন দলটির মহাসচিব। মির্জা ফখরুল বলেন, 'যদি একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়, সে নির্বাচনে কিন্তু বিএনপি এ কথাগুলোর উত্তর দিতে প্রস্তুত রয়েছে।'
বিএনপির অনেক নেতাই মনে করেন দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে আছে। এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে তারা সামনের দিকে কিভাবে এগুতে পারে সেটি মূল লক্ষ্য দলটির।


কোন দিকে যাবে?
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর দলটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে কয়েকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে অপ্রতিদ্ব›িদ্ব শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। জনগণের মাঝে দলটির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণীত হয়। অনেকেই মনে করেন বিরোধী দল থেকে সরকারী দলে পরিণত হওয়ার জন্য শুধুমাত্র কয়েক মাস পরের সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা বাকি ছিল। কিন্ত ‘সেই’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং যার ফলে ওলটপালট হয়ে যায় বিএনপির সব হিসাব নিকাশ। জনগণের ভোট চলে যায় নির্বাসনে; বিধ্বস্ত হয়ে যায় বিএনপি। তবে বিস্ময়কর যে এত বিশাল জনপ্রিয়তা থাকার সময়ে প্রতিষ্ঠার ৩৮তম বার্ষিকীতে এসে দলটি এখন অস্বাভাবিকভাবে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দলটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না। কারণ দলটি এখন দীর্ঘতম সময় সরকারের বাইরে থাকার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দুরবস্থায় রয়েছে।
বিশেষ প্রক্রিয়ার এবং সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনার দশম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির শিকার হয়ে বিএনপি এখন সাঁতার না জানা মানুষের মত অথৈ জলে হাবুডুবু খাচ্ছে। ভোটহীন যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে তা মুলত বিএনপিকে টার্গেট করেই। যদিও এই টার্গেটে চুড়ান্ত প্রতিপক্ষ করা হয়েছে জনগণ বা ম্যান্ডেটকে, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে বিএনপি। যতদিন এ অবস্থা বিরাজমান থাকবে, বিএনপি ততবেশি দিশাহারা হয়ে যাবে। বিএনপির জন্য এখন পরিস্থিতি এমন যে রাজনীতি করতে হলে হয় জীবন হাতে নিয়ে রাজপথে আসো, জেল খাটো, ঘর ছাড়ো আর না হয় রাজনীতিটাই ছেড়ে দেও। দশম সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে দুটো বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: বিএনপি রাজনীতি করতে পারবে না এবং জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবে না। শুধু এ অবস্থা চলমান থাকলেই বিএনপিকে দৃশ্যত ‘অচল’ হয়ে থাকতে হবে।
তবে প্রশ্ন হতে পারে বিএনপি আজ যে বিপর্যয়ে পড়েছে তা কি এড়ানো যেত না? এটা নিশ্চিত ছিল যে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি অংশগ্রহণ করতো এবং আজকের এ পরিণতি ভোগ করতে হতো না। সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস আগে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনই তার প্রমাণ। কিন্ত তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকায় বিএনপি অনিবার্য আশঙ্কা থেকে সে নির্বাচন বয়কট করে। নেমে পড়ে নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলনে। সে আন্দোলনের কারণেই ১৫৩ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। বাকি আসনগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি সেদিনের মিডিয়ায় হাসি তামাশার খোরাক হয়েছিল। এরপরও যদি বলা হয় যে বিএনপি ভোট ঠেকাতে পারেনি তাহলে গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে জনগণের সাথে সম্পর্কহীন হিসাবেই বিবেচনা করতে হয়। যে পরিকল্পনায় ম্যান্ডেটকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে ধরা হয়েছিল সে পরিকল্পনার প্রাথমিক বাস্তবায়নে বিএনপির এ পরিণতি অনিবার্য ছিল।
মুলত রাজনীতি থেকে বিএনপিকে মাইনাস করে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এখন  খোদ রাজনীতিকেই মাইনাস করা হয়েছে। ম্যান্ডেটের তো প্রশ্নই আসে না। তাই বিএনপি এখন অঘোষিত নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল। বিগত সংসদ নির্বাচনের পর যেভাবে উপজেলা নির্বাচন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ওটাই এখন এদেশের নির্বাচনের মডেল। আর এ মডেল চলমান রাখা সম্ভব যদি বিএনপিকে নিষ্ক্রিয় কিংবা নিশ্চিহ্ন করে রাখা যায়। ইতোমধ্যে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বিএনপি এখন কর্মসূচিবিহীন অথচ বিবৃতিসর্বস্ব একটি রাজনৈতিক দলের নাম ছাড়া কিছু নয়। যত বেশি সক্রিয় কিংবা প্রথম সারির নেতা তত বেশি মামলা। শুধু বিরাজমান এ পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারলেই বিএনপিকে বিলুপ্ত করে দেওয়া সম্ভব সেরূপ ভিশন প্রতিপক্ষের মনে তৈরি হতেই পারে।
বিএনপির শক্তির প্রধান উৎস জনগণ। সেই জনগণের উপর ভর করেই বিএনপি সরকারে ফিরে আসতে চেয়েছিল। কিন্ত সেই জনগণকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে দশম সংসদ নির্বাচনে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। আগামীতে সবগুলো আসনে ভোট না হলেও সরকার গঠনে আইনগত সমস্যা হবে না। আবার যে নির্বাচনে জনগণের ভোট জয় পরাজয়ে কোনো প্রভাব রাখবে না সেরূপ নির্বাচনে বিএনপির সুদিন ফিরবে না। অন্যদিকে বিএনপির অংশগ্রহণ করা না করাতে নির্বাচন ও সরকার গঠনেও কোনো সমস্যা হবে না। এভাবে যদি বিএনপিকে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা প্রতিদ্ব›িদ্বতার বাইরে রাখা যায় কিংবা জনমতের প্রতিফলন এড়ানো ভোট সম্ভব হয় তাহলে রাজনীতির সাথে সাথে দলটিও অদৃশ্যমান হয়ে যাবে। এখন এ অবস্থায় কি করতে পারে বিএনপি? হয় সামনে আসা, না হয় দৃশ্যের বাইরে যাওয়া। বিলুপ্তি কখনোই সম্ভব হবে না কারণ বিএনপির যে জনসমর্থন তা প্রতিপক্ষের দিকে চলে যায়নি। রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কারণেই তা যাবে না। কিন্তু এই বিশাল জনসমর্থন দিয়ে বিএনপি কি করবে যদি দেশে ভোটের রাজনীতি ফিরে না আসে? আবার ভোটের রাজনীতি এদেশে আপাতত আর ফিরবে না যদি বিএনপি ফেরাতে না পারে। কারণ বিএনপির প্রতিপক্ষ ততদিনই এভাবে টিকে থাকবে যতদিন ভোট না ফেরে। লড়াইটা এখন সুস্পষ্ট। একপক্ষ জনগণবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পক্ষে এবং অন্য পক্ষ জনগণের ভোটের পক্ষে। একপক্ষে রাষ্ট্রের সকল শক্তি; অন্যপক্ষে শুধু নিরব জনমত।
রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করে রাষ্ট্রের জনগণ টিকতে পারে না। তা কখনোই কাক্সিক্ষত নয়। অন্যদিকে রাজপথ ছাড়াও রাজশক্তির অপব্যবহার বন্ধ করা কিংবা দখলমুক্ত করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় যে জনগণকে ভোট দেয়ার জন্য ঘর থেকে বের হতে হয়নি সেই ঘুমন্ত জনগণকে ভোটের মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানোর মত পরিস্থিতি তৈরি না করা পর্যন্ত বিএনপির পুনরুত্থান সম্ভব নয়। যদিও বিএনপির প্রতিপক্ষ এখন দলটির ’বিলুপ্তি’ ছাড়া আর কিছুই ভাবছে না। শেরে বাংলা নগরের মাজারটিও স্থানান্তরের হুমকিতে আছে।
১৯৭৮ সালের আজকের এই দিনে সামরিক শাসনামলে ক্ষমতায় থেকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। তার প্রতিষ্ঠিত এ দলটি নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে পাঁচবার দেশ শাসন করেছে। অবশ্য এর মধ্যে বেশ কয়েকবার ভাঙনের কবলেও পড়ে দলটি। প্রথমে হুদা-মতিন, দ্বিতীয়বার শাহ আজিজ, তৃতীয়বার কে এম ওবায়দুর রহমান, চতুর্থবার অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, পঞ্চমবার কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবং ষষ্ঠবার আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ভাঙনের মুখে পড়ে বিএনপি। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনে চরম দুঃসময় নেমে আসে বিএনপিতে। এ সময় দলটি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে খোদ খালেদা জিয়ার সুদৃঢ় নেতৃত্ব ও তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সংগঠনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় এযাত্রায় তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এরপর বিপর্যস্ত দলটি ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও দল আজও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সারা দেশে এখনো সবচেয়ে বেশি জনসমর্থন আছে। কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামো ভঙ্গুর। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তেও দলটি পিছিয়ে পড়েছে। জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতেও বিএনপির অবস্থানকে ভালো চোখে দেখছে না বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি। সরকার মোকাবিলায় দলের নেই শক্তিশালী কর্মকৌশল। নেতা-কর্মীদের মধ্যে আস্থাহীনতা চরমে। অতীতের ভুল থেকেও শিক্ষা নিচ্ছে না দলটি। বিএনপি নেতারা অবশ্য বলছেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিএনপি এখন শক্তিশালী। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামোও রয়েছে। তবে সরকারের জুলুম, নির্যাতনসহ নানাভাবে হয়রানি বহুগুণে বেড়ে গেছে। কোনো সভা-সমাবেশও করতে দেওয়া হয় না। এতে স্বাভাবিকভাবেই দল পরিচালনা করতে গিয়ে নানামুখী সমস্যায় পড়তে হয়। এরই মধ্যে তারেক রহমানকে এক মামলায় সাত বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা শেষ পর্যায়ে। যে কোনো সময় রায় হয়ে যেতে পারে। দলের সিনিয়র সব নেতার বিরুদ্ধেই মামলার খড়গ ঝুলছে। এ প্রসঙ্গে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল­াহ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায় ছয় কোটি মানুষ খালেদা জিয়াকে ভালোবাসেন।
তাই আজকে জনগণের সমর্থনের ওপর চাপ দিতে হবে। সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য খালেদা জিয়াকে আজ দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিএনপির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা হয় অসুস্থ, নাহয় নানা কারণে হতাশায় ভুগছেন। এটা কাটাতে হবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাদের প্রতিশ্র“তি দিতে হবে, তারা অতীতে যেমন জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন, ভবিষ্যতেও সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়াবেন।’ তিনি বলেন, ‘অতীতের ভুলভ্রান্তিগুলো সংশোধন করতে হবে। ভুলভ্রান্তি বলতে বোঝাচ্ছি, অতীতে অপারেশন ক্লিন হার্ট ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২১ আগস্টের মতো মর্মান্তিক ঘটনা। এর দায় তারা এড়াতে পারে না। এ-জাতীয় ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, জঙ্গিবাদের যেন পুনরুত্থান না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এটা জনগণকে নিশ্চিত করতে হবে। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ বিএনপি সমর্থিত এই বুদ্ধিজীবীর মতে, ‘৩৮ বছরে বিএনপি জনগণের মনে একটি স্থায়ী আসন করে নিয়েছে এটা সত্য। কিন্তু তাদের নেতারা হতাশায় ভুগছেন। দেশের স্বার্থে বিএনপিকে ভালোভাবে বেঁচে থাকা দরকার। মুসলিম লীগ হয়ে কিংবা ভাসানী ন্যাপ হয়ে থাকাটাকে বেঁচে থাকা বলে না। তাই আজকের দিনে তাদের প্রতিজ্ঞা করা উচিত, তারা দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন। তাদের স্থায়ী কমিটির মিটিং হবে প্রতি সপ্তাহে। প্রতিদিন তাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলবেন। জনতার মুক্তির জন্য সনদ তৈরি করবেন। তার একটা রূপরেখা আমি আমার খোলা চিঠিতে উলে­খ করেছি। জনগণকে প্রতিশ্র“তি দিতে হবে সুন্দর জীবনযাত্রার। তাহলে দেখা যাবে, হয় তারা ক্ষমতায় থাকবে, নাহয় শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশের উন্নতিতে যুক্ত হবে। এটাই আমার কামনা।’


সামনে কঠিন দিন!
বিএনপি এখন রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ নয় বছরেও নাজুক পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারছে না বৃহৎ এই দলটি। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনের ‘ভুল’ সিদ্ধান্তে প্রধান বিরোধী দলের ‘মর্যাদা’ হারিয়েছে বিএনপি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি আদায়ের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। নাশকতা-বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় রাজপথেও কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অনুমতি দিচ্ছে না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। চার দেয়ালের ভেতর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তনের মধ্যেই পালন করতে হচ্ছে ‘বিক্ষোভ সমাবেশে’র মতো রাজপথের কর্মসূচি। আগামী এক বছরের মধ্যে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন নেতাকর্মীরা। লন্ডনে অবস্থানরত সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ মামলার জালে কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় নেতা। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই খালেদা-তারেকসহ অনেক শীর্ষ নেতা সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচনে ‘অযোগ্য’ হওয়ারও শঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে বিএনপির সামনে কঠিন দিন। অবশ্য বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করেন, আঁধার কেটে গিয়ে আলো ফুটবেই।
জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দল পুনর্গঠন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে তারা। পদবঞ্চিত ও অবমূল্যায়নের কারণে দলে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার হুমকিও দিচ্ছেন অনেকে। সাড়ে চার মাস পর ঘোষিত নতুন কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হননি, হতাশায় ডুবেছেন। মাঠপর্যায়েও কাউন্সিলের আগে সব জেলা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়নি।
এই দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা নিয়েই নতুন করে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ডাকও হালে পানি পায়নি। জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার শর্ত দিয়েছে প্রগতিশীল কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ভোটের হিসাব মাথায় থাকায় খালেদা জিয়া কোনো হিতোপদেশ শুনছেন না। সর্বশেষ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধে জনমত পক্ষে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ অবস্থার মধ্যেও আগামী বছরের প্রথম দিকে সরকার সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পারে বলে ক্ষীণ আশা রয়েছে দলটির মধ্যে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির সামনে কঠিন সময়। শীর্ষ নেতাদের বিচারাধীন মামলা-মোকদ্দমাসহ ক্ষমতাসীন দলের নানামুখী চাপের মুখে দলটিকে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিগত নয় বছরেও দলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আগামী নির্বাচনের আগে কীভাবে সুসংগঠিত হবে, তা দেখার বিষয়। এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, দেরিতে হলেও বিএনপির নতুন কমিটি হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাঠামো হয়েছে। তৃণমূলও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ খুবই সুসংগঠিত। তাদের কার্যক্রম মোকাবেলা করে বিএনপির টিকে থাকা এবং এগিয়ে যাওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তার ধারণা, সরকার আগামী বছরের প্রথম দিকে সাধারণ নির্বাচন দিতে পারে। নির্বাচনে ভালো ফল করতে হলে বিএনপিকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিকভাবে সুসংগঠিত করা দরকার।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপিও একই চেষ্টা করেছে। এ আত্মঘাতী রাজনীতি থেকে সবাইকে সরে আসতে হবে। তেমনি বিএনপিকেও গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক একটি শক্তিশালী দল হিসেবে বিকশিত হওয়া জরুরি। বিএনপি যদি অর্থবহ গণতান্ত্রিক রাজনীতি না করে এবং বিলুপ্তির পথে যায়, তাহলে তাদের কর্মীরা সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদী দলে যোগ দিতে পারে। এটি কারও জন্য কাম্য নয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সম্প্রতি একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল­াহ্ চৌধুরী। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হলেও নানা সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসনকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন তিনি। জাফরুল­াহ্ চৌধুরী বলেছেন, দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপিকে বাঁচাতে হবে, টিকেও থাকতে হবে। জনতাকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে এবং ভারতের বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রম উন্মোচন করতে হবে। বিএনপিতে গণতন্ত্র স্থাপন করতে হবে। এককেন্দ্রিকতা পরিহার করতে হবে। অবশ্য চিঠিতে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেছেন, আপনার হাতে সময় আছে বড়জোর ৯ মাস। সম্ভবত এ সময়ের মধ্যে আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় রাজনৈতিক আলোকে বিচারের রায় বের হবে। ষষ্ঠ কাউন্সিলেও ঘুরে দাঁড়ানোর আকাক্সক্ষা, বাধাও কম নয় :২০০৯ সালে পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে বিপর্যস্ত দলকে ‘নবরূপে’ ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে সফল হয়নি বিএনপি। আট বছর পর নাজুক সাংগঠনিক পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে গত ১৯ জানুয়ারি দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করেও একই ঘোষণা দিয়েছিল দলটি। এমনকি কাউন্সিলে আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেনথ তারও একটি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
অবশ্য কাউন্সিলে দলের নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা না করে দীর্ঘ কালবিলম্ব করায় নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হওয়ার বদলে হতাশ হয়ে পড়েন। ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের মূল্যায়নের কথা ঘোষণা দিলেও সাড়ে চার মাস পর ঘোষিত কমিটিতে অনেককে সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নিথ অভিযোগ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। এ পরিস্থিতিতে অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন অনুসারীদের। বিশেষ করে দলের সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমানকে স্থায়ী কমিটির সদস্য না করায় চট্টগ্রামে তার অনুসারীরা গণপদত্যাগ করারও হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
এদিকে কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব-কোন্দলে লিপ্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্যদের মধ্যে আস্থার সংকট চলছে। গুলশান কার্যালয় ও নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে ঘিরেও তৈরি হয়েছে একটি ‘শক্তিশালী সিন্ডিকেট’। কার্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তার ওপর ক্ষুব্ধ দলের কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের অধিকাংশ নেতা। ওই সিন্ডিকেটটি এত প্রভাবশালী যে, দলের পদ ও মনোনয়নবাণিজ্যে জড়িত ‘বিতর্কিত’ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদপদবি দিতেও তারা খালেদা জিয়াকে প্রভাবিত করেছেন। দলের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বাদ দিয়ে নিজ নিজ ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নে ব্যস্ত ওই সিন্ডিকেটটি। এমনকি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও মহাসচিবের পুরো সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দিচ্ছেন না তারা। সিনিয়র নেতাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব না দেওয়ায় তারাও অনেকটা নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়ের মতো এবং ১৯৯১-এর মতো দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। অন্যথায় বিএনপি শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। একইসঙ্গে তারা বলেন, দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামকে কার্যকর এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে দলকে গতিশীল করতে হবে।
মাঠ নেতারা আরও বলেন, দলের ভেতর অবিশ্বাস-সন্দেহ ও সংশয় দূর করে সিনিয়র নেতাদের আস্থায় আনতে হবে বিএনপি নেত্রীকে। অন্যথায় শুধু কিছু সাবেক আমলা ও অরাজনৈতিক ব্যক্তির পরামর্শে দল পরিচালনা করলে নির্বাচনে অংশ না নেওয়া এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করার মতো ভুল পরামর্শে দল আরও পিছিয়ে যাবে।
নাম প্রকাশ না করে বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, সত্যিকারের যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে ব্যক্তিগতভাবে তেলবাজ ও চাটুকাররাই কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে জুনিয়রদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার পর তাদের অধীনে সক্রিয় রাজনীতি করা কঠিন। বিএনপির সম্পাদক (বিশেষ দায়িত্বে) ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বিএনপি মূল রাজনীতি ধরে এগোতে চেষ্টা করলে দলটির পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো খুবই সম্ভব। এমনকি ঘুরে দাঁড়ানোর সব বাস্তব পরিস্থিতি বিদ্যমান।

ইস্যু খুঁজছে বিএনপি :

রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠে সরব হওয়ার চেষ্টা করছে বিএনপি। এখন সামনে যে ইস্যু পাচ্ছে, সেটাকেই কাজে লাগিয়ে জনসমর্থন আদায় ও রাজপথে নামার ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করছে দলটি। অনেক দিন পর জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ঢাকায় জঙ্গিবিরোধী একটি জাতীয় কনভেনশন করারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে তা বেশিদূর এগোয়নি। জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার আগে বিএনপির সঙ্গে কোনো ঐক্য হতে পারে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলো। এ পরিস্থিতিতে এখন জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দলকে নিয়ে ঐক্য গড়া এবং জামায়াতের ভোট ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ কষছেন খালেদা জিয়া। জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগ আর বেশিদূর এগোবে না বলে আভাস পাওয়া গেছে।


 
এ পর্যন্ত সর্বাধিক পঠিত

  ইনফোটেক : ইন্টারনেট নিয়ে গ্রাহক প্রতারণা!
  অনুসন্ধান : কয়টি সিম রাখা যাবে?
  পোস্টমর্টেম : নকল ডিমে রাজধানী সয়লাব
  সাহিত্য : নাথ সাহিত্যের স্বরূপ
  প্রবাস : চিতোর, ইতিহাসের তিন নারী
  অর্থনীতি : মূল বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশজাতীয় বেতন কমিশনের রিপোর্টে যা আছে
  আন্তর্জাতিক : যেভাবে যৌনদাসীদের ভোগ করছে আইএস জঙ্গিরা
  বিশেষ প্রতিবেদন : ক্যাপ্টাগন: জঙ্গিদের টেরোরিস্ট ড্রাগ!
  সমকালীন : বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কূটনীতির দৃষ্টিতে মোদীর ঢাকা সফর
  সাহিত্য : শিরোমণি আলাওল
  আন্তর্জাতিক : ভয়ঙ্কর আইএস-এর উত্থান ও নৃশংসতা!
  প্রশাসন : চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল হচ্ছে!
  চমক! : জমজমের পানি নিয়ে জাপানী বিজ্ঞানীদের রহস্য আবিষ্কার!
  সাহিত্য : মগের মুল্লুকে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ
  প্রচ্ছদ প্রতিবেদন : গুলশান ট্র্যাজেডি! কেন এই নৃশংসতা?
 





free counters



উপদেষ্টা সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল-হারুন   |  সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ জিয়াউল হক   |  প্রধান সম্পাদক : আসিফ হাসান

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: দেওয়ান কমপ্লেক্স, ৬০/ই/১ (৭ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: +৮৮-০২-৯৫৬৬৯৮৭, ০১৯১৪ ৮৭৫৬৪০  |  ফ্যাক্স: +৮৮-০২-৯৫৬৬৩৯৮

ইমেইল: editor@weeklymanchitra.com, manchitra.bd@gmail.com
©  |  Amader Manchitra

Developed by   |  AminMehedi@gmail.com