আমাদের মানচিত্র  |  বর্ষ: ৪, সংখ্যা: ২৮     ঢাকা, বাংলাদেশ  |  আজ শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭  |  




আর্কাইভ সংখ্যা - বিএনপি’র দুর্বলতা ও রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা!

আর্কাইভ সংখ্যার প্রচ্ছদ



বর্ষ: ৪, সংখ্যা: ২৮
রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬




 
একনজরে এই সংখ্যা -

  সম্পাদকীয় : পবিত্র ঈদুল আজহা ও ত্যাগের পরীক্ষা
  প্রবাস : জন্ম ও মৃত্যু নিয়ে এলিজাবেথ কুবলার রস
  বিশেষ প্রতিবেদন : অর্থের জোরও ঠেকাতে পারেনি মীর কাসেম আলীর ফাঁসি
  ফিচার : রূপকথার এক প্রেমকাহিনী!
  অনুসন্ধান : পিলার চুরি ও বজ্রপাতে প্রাণহানির নেপথ্যে...
  পোস্টমর্টেম : ফারাক্কা নিয়ে নীতিশের প্রস্তাব ও প্রকৃতির প্রতিশোধ!
  স্মরণ : ঢাকায় থাকেন সিরাজ উদ-দৌলার বংশধর!
  ইনফোটেক : স্মার্ট কার্ড: যেভাবে পাবেন
  স্মৃতিচারণ : আঠারোটি বুলেট ও রক্তস্নাত বাংলাদেশ
  প্রতিবেদন : দুই জোটের অর্ধেক রাজনৈতিক দলেরই নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই
  অর্থনীতি : গ্যাসের মূল্য: আবার বাড়ছে কার স্বার্থে?
  প্রচ্ছদ প্রতিবেদন : বিএনপি’র দুর্বলতা ও রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা!
  ধর্ম : জরথ্রুস্টঃ ইরানের প্রাচীন ধর্ম
  বিশেষ প্রতিবেদন : জঙ্গি দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স!
  রাজনীতি : দুই ডজনেরও বেশি নেতা বিএনপিকে বিদায় জানাচ্ছেন!
  কলাম : জেলা, মহকুমা ও উপজেলার ইতিবৃত্ত
  দুর্নীতি প্রতিবেদন : মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা?
  চমক! : ফেরাউন ও মূসা
 



প্রবাস পড়া হয়েছে ৪২৪ বার

জন্ম ও মৃত্যু নিয়ে এলিজাবেথ কুবলার রস

আবদুল­াহ আল-হারুন, জার্মানি থেকে

(গত সংখ্যার পর)


পঞ্চম ও শেষ পর্যায় : স্বীকৃতি


আমার যাবার সময় হল,   আমায় কেন রাখিস ধরে।
চোখের জলের বাঁধন দিয়ে   বাঁধিস নে আর মায়ডোরে
ফুরিয়েছে জীবনের ছুটি,     ফিরিয়ে নে তোর নয়নদুটি-
নাম ধরে আর ডাকিসনে ভাই,   যেতে হবে ত্বরা করে------রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


যখন দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর শেষ সময়টি আসতে বেশ দেরি হয়, এবং সে আকষ্মিকভাবে মারা যায় না এবং সর্বোপরি যদি সে প্রাথমিক পর্যায়গুলি অতিক্রম করার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করে, তখন সে মৃত্যুপথের শেষ ধাপটিতে আসার বিরল সুযোগটি পায়। এই পর্যায়ে সে তার দুর্ভাগ্যকে আর দুর্দশার প্রতীক হিসেবে দেখে না এবং এর জন্য কোন অসন্তষ্টিও বোধ করে না। এবং এই নতুন মোড়টিতে এসে সে যাবতীয় হতাশা আর নিরাশা থেকে মুক্তি পেয়ে মনে এক ধরনের প্রশান্তির আমেজ অনুভব করে। সে এখন তার মনের কথা কোন আবেগ ছাড়াই প্রকাশ করতে পারে। জীবনের প্রতি বা যারা আশেপাশে সুস্থ হয়ে তার দেখাশোনা করছে, তাদের প্রতি তার তার কোন ঈর্ষা থাকে না। তার সব প্রিয়জন, সন্তানসন্ততি, বন্ধুবান্ধব তাদের এবং যে সমস্ত জায়গা তার একান্ত প্রিয়, এসবই শিগগিরই আর সে দেখতে পাবে না, এ জন্য তার দুঃখ প্রকাশ করে এবং সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়া আরম্ভ করে। তার শেষ সময়টিকে সে এখন কম বেশী ধীর স্থিরভাবে গ্রহণ করে এবং এক ধরনের প্রত্যাশার (মৃত্যুর পর) আলোতে এই আপাত আঁধার পরিবেশে তার আসন্ন যাত্রাটিকে সহনশীল করে তোলার একটা প্রচেষ্টা নেয়। সে ক্লান্ত, দুর্বল এবং বেশীরভাগ সময়েই তন্দ্রালু ও নিদ্রাকাতর এবং সামান্য বিরতির ফাঁকে ফাঁকে সে গভীর ঘুমে ঢলে পরে। এ নিদ্রাটি অবশ্য তার হতাশার সময়ের চাইতে আলাদা। এটি এখন তীব্র ব্যাথার আক্রমনের ফাঁকে বিধ্বস্ত শরীরে ভালমত শ্বাস নেবার প্রচেষ্টা নয়, দুশ্চিন্তাকে আপাতত ভুলে থাকার জন্য নয় এবং বলাবাহুল্য বিশ্রামের জন্যও নয়। এখন তার ঘোর নিদ্রার সময়টি বেড়ে যাওয়া নবজাতকের দিবারাত্রি বেশীরভাগ সময়ে ঘুমিয়ে থাকার সাথে তুলনা করা যায়। তবে ব্যাখ্যাটি বিপরীত। জন্মের পর শিশুর দীর্ঘ ঘুমের কারণ সে মায়ের জঠরে ন’মাস কুঁকড়ে ছিল  এখন বাইরে এসে দেহের গ্রন্থিগুলির জট একের পর এক খুলতে থাকে এবং এজন্যই এসময়ে তার ছোট্ট দেহটি খুবই ক্লান্ত। সমাজবিজ্ঞানীরা এ ঘুমকে শিশুর ভবিষ্যত জীবনের প্রস্তুতিও বলে থাকেন। অপরপক্ষে সারা জীবনের সংগ্রামশেষে মৃত্যুপথযাত্রীর দেহটিও শেষ মৃহূর্তে এসে নবজাত শিশুর মতই  হয়রান। তাই তার দীর্ঘ নিদ্রা। শিশুর ভাবী জীবনের প্রস্তুতি নেবার মতই এটা তার মৃত্যুর জন্য তৈরি হওয়া।
এ পর্যায়টিকে কোনমতেই হতাশায় আত্মসমর্পন বা বিষাদাচ্ছন্ন বলা যায না। এবং রোগীর মনে এ সময়ে জীবনের অসারতা বা ‘বেঁচে থাকার আর কি দরকার’  বা ‘আমার আর বাঁচার সংগ্রামে কোন আগ্রহ নেই’  জাতীয় পার্থিব চিন্তাভাবনা আর থাকে না। এ ধরনের নিরাশার কথাবার্তা আমরা প্রতিনিয়তই শুনতে পাই এবং এর আরেকটি অর্থও আছে, প্রকৃতপক্ষে বক্তা সুস্থ থেকে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার তার আকাক্সক্ষাটিকে মৃত্যুপর্যন্ত সজীব রাখতে চায়, কিন্ত বাস্তবে সাময়িক হতাশায় বিপর্যস্ত। কিন্ত মনে রাখতে হবে মৃত্যুর অব্যবহিত পুর্বে, যে যাত্রী আগের চারটি পর্যায় পেরিয়ে এসেছে, তার মনে এ ধরনের আকাক্সক্ষা আর অবশিষ্ট নেই।
আবার শেষ পর্যায়ে রোগীর মৃত্যুকে স্বীকার করে নেয়াটাকে একটা সুখের মুহূর্ত (রোগীর জন্য) বলে মনে করাটাও ভুল। এ সময়টিতে সুখ দুঃখ বোধের বাইরে তার অবস্থান। ষড়রিপুর ছয়টি ইন্দ্রিয়শক্তির সবগুলিই তাকে এখন প্রায় পরিত্যাগ করেছে। অনেক সময় আগের শারীরিক তীব্র ব্যাথাও আর সে তেমন বোধ করে না। রোগের রিরুদ্ধে সংগ্রামের আর কোন আগ্রহই তার নেই। এখন সামনের দীর্ঘ যাত্রার আগে শেষ শান্ত বিশ্রাম। নীরব বিরতি। এ ধরনের একটা মন্তব্য আমি নিজেও শেষ যাত্রার আগে আমার এক রোগিনী বান্ধবীর কাছে শুনেছি। মৃত্যুর দু-এক দিন আগে হঠাৎ তিনি বললেন: ‘আবদুল­াহ, আমার স্যুটকেসটি গুছিয়ে দাও, সামনেই আমার বিরাট সফর। দেখো ওঘরে একটা লাল স্যুটকেস আছে, ওতেই সব গুছিয়ে দাও। পেস্ট ব্রাশ দিতে ভুলো না। আমার মেকআপ বাক্সটা অবশ্যই দিবে। ওখানে স্মিথের (তার দীর্ঘদিনের প্রয়াত স্বামী) সাথে দেখা হবে। ওর সামনে তো এরকম ভিখারিনীর মত অপরিস্কার হয়ে যেতে পারবো না। খোদা করুন, ওখানে ভালো বাথরুম আর স্নানের ব্যবস্থা আছে। তোমার কি মনে হয় আবদুল­াহ?’  আমি তাকে আস্বস্ত করে বললাম: ‘যেখানে মি: স্মিথ তোমার সংগে পুনরায় মিলিত হবার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছে, সেখানে কি তিনি তোমার জন্য একটা ভালো করে স্নানের ব্যবস্থা রাখেন নি? তিনি তো জানেনই, তুমি প্রতিদিন নাহাও এবং কেমন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। তুমি এখনও এত সুন্দর যে মি: স্মিথ তোমাকে দেখে মোহিত হয়ে যাবেন।’ আমার কথা শুনে মিসেস স্মিথ সলজ্জভাবে স্মিত হেসে বললেন, বাড়িয়ে বলছো তুমি আমাকে খুশী করার জন্য। যাও গোছানো শুরু করো, আমি এখন বিশ্রাম নেবো। সামনে বড় জার্নীর ধকল আছে। বলেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
এ সময়টিতে রোগীর চেয়ে তার পরিবার আর আত্মীয়স্বজনের প্রতি বেশী সতর্ক থাকতে হয়। তাদেরই এখন বেশী সঙ্গের আর সাহায্যের প্রয়োজন। মৃত্যুর সাথে সমঝোতা করে রোগী এখন বলতে গেলে একধরনের শান্তি আর স্বস্তির মধ্যে আছে। এখন তার দাবীদাওয়া আর চাহিদা মাত্র একটি বাসনাতেই সীমাবদ্ধ। সে চায় সবাই তাকে এখন একা শান্তিতে থাকতে দিক। এবং সে বাইরের বাস্তব জীবনের সমস্যা আর দৈনন্দিন খবরাখবর শোনার কোনই আগ্রহ আর পোষণ করে না। অভ্যাগতদের সাথে সাক্ষাত করারও আন্তরিক কোন ইচ্ছা তার আর থাকে না। অতিথিরাও বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন রোগী আর আগের মত উৎসাহ নিয়ে তাদের সাথে কথা বলছে না। যে আগে টিভি দেখার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল, সে আর তার কোন প্রসংগই তোলে না। হজপিসকর্মীর বা আত্মীয়স্বজন যারা তার শয্যাপার্শ্বে থাকে তাদের সাথে কথাবার্তাও অত্যন্ত সীমিত হয়ে যায়। এখন বেশীরভাগ ইশারা ইংগিতেই ভাববিনিময় হয়ে থাকে। প্রায়শই এটা একটা সামান্য হাতের ইশারা  বা চোখের নাড়াচাড়া যা করে  রোগী  বলে: কথা বলার ইচ্ছা নেই, তবে তুমি পাশে থাকো। রোগী চায় তার হাত ধরে কেউ শয্যাপার্শ্বে নীরবে বসে থাকুক। একদম একা সে থাকতে চায় না। নীরবতার এ মুহুর্তগুলিতে যারা মৃত্যুপথযাত্রীদের পাশে থাকতে কোন ধরনের অস্বস্তিবোধ করেন না, সে সব আত্মীয় স্বজন বা কর্মীর জন্য
রোগীর সাথে চোখের ইশারা আর হাতের নাড়াচাড়ায় ভাববিনিময়টিই সবচাইতে কার্যকরি, যথার্থ, সহজ এবং সময়োপযোগী। উভয়ে মিলে বাইরের বাগানে পাখীর গান বা বাতাস বয়ে যাবার মর্মর শব্দ শোনা সবই এ সময়ে রোগীর পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের দুঃখে তার আত্মাকে প্রশান্তি দান করে। আমার তার শয্যাপার্শ্বে উপস্থিতি তাকে আশ্বস্ত করে, এ শেষ যাত্রায় সে একা নয়। আমি তাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গ দেব। তাকে বুঝতে দিতে হবে তার সব দায়িত্ব আর কর্ত্যব্যই সে সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছে। আর তার কোন ব্যাপারে কথা বলার আবশ্যকতা নেই। এখন শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা যখন তার চক্ষুদুটি চিরনিদ্রায় মুঁদে যাবে।  সেও বুঝতে পারে, সে কথা বলতে না চাইলেও বা যদিও তার স্মরণশক্তি আর নেই, সে একা নয়। তাকে একলা রেখে সবাই চলে যায় নি। যদিও তার চোখের দৃষ্টি যা বালিশের মধ্যে প্রায় ডুবে থাকে, সরব কথার চাইতে অনেক বেশী বলে।
এ সময়ে রোগীর সংগে দেখা করার সবচাইতে ভালো সময়টি হল সন্ধ্যা। গোধুলি লগনে, যখন দিন বিদায় নিয়ে রাতের আগমনি ঘোষণা করে। এ সময়টিতে সব দিকে একটা বিদায়ের রেশ বয়ে যায়। রোগীর মন মানসিকতার সাথে এ সময়টির বেশ মিল আছে। সেও তো বিদায়বেলার মালাখানি হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে। ওপারে তার প্রিয়জনকে পড়িয়ে দেবার জন্য। এ যেন দিনে হারিয়ে যাওয়া সন্তানের সন্ধ্যায় গৃহে ফিরে আসা। হাসপাতালে রোগীরা এ সময়েই সারাদিনের ডাক্তার নার্সদের কর্মকাণ্ডের সমাপ্তির পর এবং বিকেলে রোগীদের দেখতে আসা আত্বীয়স্বজনদের বিদায় নেবার পর নীরবতার মধ্যে বিশ্রাম নেবার সুযোগ পান। এ সময়ের দর্শনটি আরেকটি কারণে প্রয়োজনীয়। সন্ধ্যায় হঠাৎ করে সব দিকে সুমসাম হয়ে গিয়ে অনেক সময়ে রোগীকে একা হয়ে যাবার বোধটি আবার বিষাদাচ্ছন্ন করতে পারে। তা ছাড়া সন্ধ্যার বিশ্রাম আর রাতের ঘুমের মধ্যেও একটা সেতু রচিত হয়। তবে দেখা করার সময়টি সংক্ষিপ্ত হলেও ক্ষতি নেই। হাসপাতালে কেউ তাকে দেখতে এলে রোগী মানসিক শান্তি পায় যে তাকে অনেকেই মনে রেখেছে, ভুলে যায়নি। তার রোগের আর কোন চিকিৎসা নেই এ অপ্রিয় সত্যটিও সে সাময়িকভাবে ভুলে যায় যদি কেউ তার হাত ধরে পাশে বসে থাকে। যে দেখা করতে আসে সেও বুঝতে পারে মৃত্যু আসলেই অতটা বীভৎস বা ভয়ংকর নয় যা অধিকাংশ মানুষই মনে করে। এবং এ ধরনের মিথ্যা বিশেষণে মৃত্যুকে ভূষিত করে তাকে সংক্রামক ব্যাধির ভয়ের মত এড়িয়ে চলে!
কিছু রোগী আছে মৃত্যুমুহূর্তের একেবারে কাছে এসেও জীবনের আশা ত্যাগ করতে পারে না। তারা এ চরম সত্যিটাকে গ্রহণ করতে পারে না। পরাজয় অনিবার্য জেনেও শেষ সময় পর্যন্ত জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাবার সংকল্প করে। এ ধরনের তথাকথিত সাহসী যোদ্ধারাও এক সময় বলেন: না, আমি আর মোটেও পারছি না। আমার সব শক্তি শেষ! এই মুহূর্তেই সে তার অসম যুদ্ধশেষের ঘোষণাটি করে। যারা ক্রমাগত এ সংগ্রামটি চালিয়ে যায় এবং অনিবার্য মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে তারা শক্তি আর সময় দুটিরই অপচয় করে। এমনও হতে পারে যে রোগীর দৃঢ় সংকল্প আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি দেখে আত্মীয়স্বজনরা আর হাসপাতালের কর্মীরা এ সময়ে মৃত্যুকে স্বীকৃতি দেয়াটাকে কাপুরষতা বা বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ মনে করেন। এটা একবারেই ভ্রান্ত ধারনা এবং বোগীকে যদি এসব বলে মিথ্যা উৎসাহ দেয়া হয় তা প্রতারণারই পর্যায়ে পরে। অবশ্য এ প্রতারণার অপবাদটি আত্মীয়স্বজনরা মানতে চাননা। তাদের কথা হল, রোগী যখন মৃত্যুর বিরুদ্ধে  লড়াই করতে চায়, করুক না!
আবার এটাও বিবেচনা করার অপেক্ষা রাখে: রোগী আত্মসমর্পণটি কি অনেক আগেই করেছে না যথাসময়ে? অনেক সময় এ পার্থক্যটি নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। বোধহয় রোগীর একান্ত ইচ্ছাটি, যে আরেকটিবার নতুন করে তার রোগটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সে তার আয়ুটিকে আরেকটু লম্বা করার সংগ্রাম আবার করতে চায়, আমাদের বিশ্বাস করে তা সমর্থন করা উচিৎ। কিভাবে আমরা দ্রুত (হযত তখনও প্রয়োজনীয় নয়) স্বীকৃতি থেকে চূড়ান্ত ও যথার্থ আত্মসমর্পনকে আলাদা করতে পারি? আমরা যদি এ দুটি সময়কে আমাদের বিবেচনার মধ্যে না রাখি এবং যখনও হয়ত তার কিছুদিন চিকিৎসার সম্ভাবনা আছে, তা এড়িয়ে গিয়ে তাকে অবিলম্বে মৃত্যুকে স্বীকার করে নেবার পরামর্শ দেই, তাহলে তাকে সৎসঙ্গ দিয়ে শান্তি দেবার বদলে বরং তাকে ক্ষতি করার ঝুঁকিই নেই। এমনও দেখা গেছে যে মৃত্যুশয্যায়ও রোগী নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থায় বেশ কিছুদিন আরো বেঁচে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। এটা অলৌকিক নয়, নেহায়েতই ডাক্তারের যথাসময়ে হস্তক্ষেপের জন্য সম্ভব হয়েছে। তবে এটা একটা স্পর্শকাতর ব্যাপার এবং কিছুটা অনিশ্চিতও বটে। এ ধরনের ঘটনাও আছে যে নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগীর মৃত্যুর আগে কিছুটা আয়ু বেড়েছে ঠিকই কিন্ত এ জন্য তাকে আগের চেয়েও বেশী যন্ত্রনা আর ব্যাথার বর্ণনাতীত কষ্টের সামনাসামনি হতে হয়েছে। রোগী পরে মৃত্যুর আগে বলেছেন, এ ভয়ানক কষ্টটি না পেয়ে বরং তার আগেই মরে যাওয়াটা ভালো ছিল।
পঞ্চম পর্যায়টি পর্যন্ত মৃত্যুপথযাত্রীর আসতে পারাটা অনেকেই একটা ঐশ্বরিক বা পরম বিষ্ময়ের ব্যাপার বলে মনে করেন। অনেকটা হঠাৎ জন্মান্ধের দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার মত। আমরা যারা দেখতে পারি, তাদের জন্য এ ধরনের দৃষ্টি ফিরে পাওয়া অন্ধদের প্রফুল­তা ও অসীম আনন্দ বোধগম্য নয়। অনেক ঝগড়াঝাটি, রাগারাগি আর হতাশার পর রোগী বাস্তবের মাটিতে পা দেন। একটি অবিশ্বাস্য শান্তির ছাপ তার সর্বাঙ্গে। যদিও আবহাওয়াটি এখনও বিষাদাচ্ছন্ন কিন্ত মনোরম। যেমন বৃষ্টির মধ্যে পরিস্কার হাওয়ায় একটি অনবদ্য প্রাকৃতিক দৃশ্য। এই গন্তব্যে পৌঁছে যাত্রীরা এক ধরনের প্রশান্ত ও ধীর জ্ঞানী হয়ে যান। হজপিস কর্মীরা একমত যে এ সময়ে আমরা তাদের যা দিতে পারি, তার চেয়ে বেশী তারা আমাদের দিয়ে থাকেন। নিশীথে তারা কোন দামী বস্ত্রে আচ্ছাদিত হোন যে দিবসে বর্ণনাতীত একটা জ্ঞানের সৌন্দর্য দিয়ে আমাদের আলোকিত ও মুগ্ধ করেন?


রূপান্তর: মৃত্যুর মুহূর্তে
এলিজাবেথ কুবলার-রস বলেন মৃত্যুর মুহূর্তে যাত্রীর পর পর তিনটি রূপান্তর ঘটে। তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত শিশুদেরকে মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রজাপতির রেশম গুটি বেরিয়ে থেকে জন্ম নেওয়ার প্রতীকটি ব্যবহার করতেন। মানুয়ের দৈহিক মৃত্যুটি ঠিক এভাবেই হয়ে থাকে। গুটির মধ্যে শূককীটটির অবস্থান মানুয়ের মৃত্যুপূর্ববর্তী জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। গুটি যেমন শূককীটটির সাময়িক গৃহ তেমনি আমরা মানুষের পার্থিব জীবনে পৃথিবীকে তার অস্থাযী বাসস্থান বলে ধরে নিতে পারি। এভাবেই আমরা মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের নশ্বর দেহটির অধিকারী। গুটি থেকে বেরিয়ে প্রজাপতি হওয়ার রূপান্তরটি হল শুককীটের জন্য ক্ষুদ্র ও অপরিসর গুটির অন্ধকার থেকে বাইরের আলোকময় পৃথিবীতে এসে নিজেকে পূর্ণ বিকশিত করার সুবর্ণ সুযোগ। তেমনি মানুষ  একদিন এখানে শুককীটের মত জীবন যাপন করে পৃথিবীর এই সীমিত পরিসর থেকে, দু:খ কষ্ট, ব্যাথা বেদনা, ব্যর্থতা, অবেহেলা, উপেক্ষা আর অনাদরের জীবন থেকে বেরিয়ে আরেকটি মনোরম জীবনে প্রবেশ করবে। নতুন পৃথিবীটি নি:সন্দেহে ছেড়ে আসাটির চাইতে অনেক বেশী সুন্দর ও বাসযোগ্য। প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা হাজার হাজার ব্যক্তি এটা আমাদের জানিয়েছেন। সুতরাং মৃত্যু হল বর্তমান গৃহের চাইতে আরও একটি বেশী সুন্দর বাসভবনে বাসাবদল।
আত্মহত্যা, হত্যা, হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে বা কোন ক্রনিকরোগে বা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েই (দেহের ক্রটিটি মেরামতের অযোগ্য হয়ে যাওয়ায়) হোক যখনি মৃত্যু ঘটবে, মনুষ্য-শুককীটটি তখনি প্রজাপতিতে রূপান্তরিত হবে। তার আত্মাটি হবে মুক্ত। এ সময়েই হবে দ্বিতীয় রূপান্তরটি। প্রতীকি ভাষায় বলা যায়, যখন প্রজাপতিটি তার শুককীটের পার্থিব দেহটি ত্যাগ করে তখন সে এমন সব অভিজ্ঞতার সামনাসামনি হয়, এ পর্যায়ে যেসব ঘটনার মুখোমুখি তার হতে হবেই, যাতে মৃত্যুকে নিয়ে তার কোন ভয় বা শংকা না হয়।
দ্বিতীয় রূপান্তরে মানুষ এক রকমের প্রাকৃতিক শক্তির সরবরাহ লাভ করে। মৃত্যুর আগে (প্রথম রূপান্তরের সময়) সে তার শরীর থেকে শক্তি পেয়ে (Metabolism) জীবনধারন করেছে। এ ধরনের শক্তি প্রয়োগের জন্য একটি সক্ষম মস্তিস্কের প্রয়োজন। এর অর্থ হল মস্তিস্ক আপনাকে সচেতন রাখে এবং সচেতনতাই আপনার অন্যদের সাথে যোগাযোগের প্রধান সূত্র। যখনি এ মস্তিস্ক (বা শুককীটটি) মৃত্যুর আগমনে ধীরে ধীরে অক্ষম হতে থাকে, আপনি আর বাইরের কারো সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারেন না। আপনার (পার্থিব) চেতনা চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। যে মুহূর্তে চেতনা লোপ পায়, তার মানে শুককীটটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গেছে যে আপনার নিশ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ, হৃদস্পন্দন বা শিরায় রক্ত চলাচলও বন্ধ এবং এ সময়েই আপনার প্রজাপতি (রূপান্তরিত) হিসেবে দেহান্তরটি সম্পূর্ণ হয়। এর মানে অবশ্য এই নয় যে আপনি এখন পুরোপুরি মরে গেছেন। বরং এটা বললে বুঝতে সুবিধা হবে যে এ সময়ে শুধু শুককীটটির ক্রিয়াকর্ম বন্ধ হয়েছে। গুটি ত্যাগ করার পর আপনাকে (দ্বিতীয় রূপান্তর) শারীরিক শক্তির জায়গায় প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা চলতে হবে। প্রাকৃতিক এবং শারীরিক মাত্র এ দুটি শক্তিই মানুষ তার নিজস্ব সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে পারে।
এ সময়ে আপনি আপনার চারপাশে, উপরে নীচে দেখতে পান। শয্যায় শায়িত আপনার শবদেহ নিয়ে কারা কি করছে আপনি সবই দেখছেন। কিন্ত আপনার দেহে রক্তচাপ, পাল্স, নিশ্বাস প্রশ্বাস কিছুই নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য এ সময়ে সামান্য মস্তিস্ক-তরঙ্গের খোঁজ মেপে পাওয়া গেছে। আপনি স্পষ্ট শুনছেন কে কি  বলছে, কে কি ভাবছে এবং দেখছেন কে কি করছে। এ পর্যায়ে অনেক প্রায় মৃতরা আবার তাদের জীবন ফিরে পেয়েছেন। তারা প্রাণ ফিরে পাওয়ার পর সঠিকভাবে বলেছেন: কিভাবে একজন দুর্র্ঘটনায় পতিত মটর গাড়ীর বদ্ধ দরজা ব্লোপাইপ দিয়ে খুলে আপনাকে বাইরে বের করেছে। অনেকেই এসব সাহায্যকারীদের গাড়ীর বা এ্যাম্বুলেন্সের নম্বর, যা নিয়ে তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, সঠিকভাবে বলেছে। অনেকে এ সময় পাশ দিয়ে চলে যাওয়া গাড়ীর নাম্বারও বলেছে। বৈজ্ঞানিকভাবে এটা কিছুতেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, যার মস্তিস্ক-তরঙ্গ স্তব্দ, সে কি করে অচেতন থেকে এভাবে গাড়ীর নাম্বার দেখতে পায় বা মনে রাখে! বৈজ্ঞানিকদের এসব ব্যাপারে কিছুটা নিরভিমান হতে হবে। আমাদেরও বিনয়ের সাথে মেনে নিতে হবে যে লক্ষ লক্ষ এরকম ঘটনা আছে বা প্রতিনিয়ত ঘটে যা সব আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারি না। এ দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌছে যে আবার তার পার্থিব দেহে প্রাণ ফিরে পেয়ে ধরায় প্রত্যাবর্তন করে এবং ওপারে  প্রয়াত প্রিয়জনদের সাক্ষাত পায়, সে পরে তার চূড়ান্ত মৃত্যু পর্যন্ত আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যায় না। মৃত্যু একটা পারাপার। ক্রান্তিকাল। যা এক দেহ থেকে আরেকটিতে উত্তরন মাত্র। জংসন ষ্টেসানে যেমন যাত্রীরা গন্তব্যে যাবার জন্য এক ট্রেন থেকে আরেকটিতে চড়েন।
মৃত্যুর পর মানুষ তার পার্থিব দেহটি জীর্ণ বস্ত্রের মত এ মাটির পৃথিবীতে পরিত্যাগ করে ফেলে চলে যায়। কারণ এটার আর তার কোন প্রয়োজন নেই। তার পার্থিব দেহটির শেষ চিহ্নটিও (দ্বিতীয় রূপান্তরের সু² দেহটি, এক সময় ইথারের তৈরি বলা হত) ত্যাগ করে এবং অনন্তকালের জন্য যে দেহটি এখন তার ধারণ করতে হবে, তার আগে সে একটি পারাপারের সামনাসামনি হয়। এই উত্তরণটি পৃথিবীর আবহমান সাস্কৃতিক ও কৃষ্টিগত উপাদানে চিহ্নিত। এটা মৃতের একটা সুড়ংগ বা দরজা বা একটা সেতু দিয়ে পার হয়ে যাবার সাথে জড়িত। এলিজাবেথ কুবলার-রস যেহেতেু সুইটজারল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন, তাই এ প্রসংগে বলেছেন: আমার দেশে গিরিপথের অভাব নেই। আল্পস পর্বতমালায় এ দেশটি ঘিরে আছে। কাজেই আমি মনে করব আমি এ পর্যায়ে আল্পসের একটি গিরিপথ যার দুপাশে আল্পস এলাকার সুগন্ধি পুস্পের ছড়াছড়ি, সেখান দিয়েই হাটছি। সুইডেনের রাজধানী ষ্টকহলম সাতটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। ২৫/৩০টি প্রধান সেতু রয়েছে এ দ্বীপগুলিতে যোগাযোগের জন্য। যে কোন ষ্টকহলমবাসীকেই কি বাসে, কি মটরগাড়ীতে বা পায়ে হেঁটে প্রতিদিন এসব ব্রীজ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কাজেই মৃত্যুর পর সে এ পর্যায়ে একটা সেতু পার হওয়ার মুখেমিুখি হতে পারে তাতে বিচিত্র কিছুই নেই। সবাই পার্থিব চিন্তা ভাবনায় তার মনে গড়া নিজস্ব স্বর্গে যেতে পারে। এবং এখানে  এলিজাবেথের মন্তব্য হল, সুইটজারল্যান্ডের অধিবাসী হিসেবে আমার স্বর্গটি অবশ্যই পাহাড় পর্বতে ঘেরা আর মনোরম আল্পস পর্বতমালার পুস্পরাশি দিয়েই গড়া হবে।  এবং যখনি এই পারাপারটি শেষ হয়ে যাবে, তুতীয় রূপান্তরটি তখনি ঘটবে। সেতু বা সুড়ংগ বা দরজা পার হবার পর একটি উজ্জল আবার স্নিগ্ধ আলোকরশ্মি  আপনাকে আলিঙ্গন করবে। এ আলোটি (প্রায় মৃতরা একবাক্যে বলেছেন) জগতের সব শুভ্র আলোর চাইতে শুভ্রতর, এ পৃথিবীর কোন উজ্জল আলোই এর মত উজ্জল নয়। এ আলোটির আবির্ভাবে আপনার দেহ মন সবই একটি অভূতপুর্ব শান্তি আর আনন্দে ভরে উঠবে। এ ধরনের অনাস্বাদিত আনন্দ জীবদ্দশায় আপনি কখনই পাননি। মন ভরে উঠবে এক বর্ণনাতীত এবং শর্তহীন ভালোবাসায়, যে ভালোবাসাটির সত্যিকার পরিমাপটি কোন ভাষাতেই প্রকাশ করা যায় না।
মৃত্যুর আগে মুত্যুপথযাত্রী যে পাঁচটি পর্যায়ের পথ পেরিয়ে মৃত্যুর মহালগ্নে উপস্থিত হন, তা আগের অধ্যায়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। পৃথিবীতে আমাদের যার যার কর্তব্য ও দায়িত্ব সমাপণের পর আমরা নির্দ্বিধায় আমাদের দেহকে ত্যাগ করতে পারি। যে দেহে জীবিতকালীন আমাদের আত্মা বন্দী হয়ে থাকে। ঠিক যেভাবে শুককীটটি গুটির মধ্যে বন্দী হয়ে থাকে, একদিন প্রজাপতি হয়ে মুক্তি পাবার জন্য। মৃত্যুর পরেই মানুষ সত্যিকার অর্থে তার সর্ববৃহৎ অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হয়। সে মটরগাড়ীর দুর্ঘটনায় না ক্যান্সারে মারা গেল, তাতে কিছু আসে যায় না। মৃত্যু মৃত্যুই। যদিও যে ব্যক্তিটি প্লেন দুর্ঘটনায় মারা গেল বা এধরনের তাৎক্ষণিক মৃত্যু যার ঘটে, তাতে সে জানতে পারে না সে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুমুখে পতিত হল কিনা। মৃত্যুতে কোন ব্যাথা, ভয়,  আফঙ্কা, অশান্তি বা উৎকন্ঠা নেই। শুধুমাত্র উষ্ণতা আর শান্তি দিয়ে মৃত্যুর অস্তিত্ব যা প্রজাপতির রূপান্তরে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও স্বাভাবিক।
এলিজাবেথ কুবলার-রস তার শেষ গ্রন্থ ‘জীবনচক্র’ (Das Rad des Lebens/1997) এ মৃত্যুলগ্ন ও তার পরে অন্য পৃথিবীতে আত্মার চিরস্থায়ী বাসস্থানটিতে পৌঁছানোর মধ্যে মোট চারটি ধাপের কথা এ বইতে পুণরায় বিস্তারীতভাবে আলোচনা করেছেন। এর আগে মৃত্যুর পর পরই যে তিনটি রূপান্তরের কথা আমরা তার কাছ থেকে শুনেছি, এটি তারই পরিপূরক। আমি তার এ বইটির সাহায্যে নিয়ে কুবলার-রসের নতুন তথ্যগুলি এখানে সংযোজন করছি। বলাবাহুল্য এ চারটি ধাপ তিনি নতুন করে ‘প্রায় মৃতদের’ (২৫০ জন)’ অভিজ্ঞতার বিবরণ শুনে ও তাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনার উপর ভিত্তি করে বইতে লিপিবদ্ধ করেছেন।

প্রথম ধাপ:  এ সময়ে মানুষ তার দেহকে ত্যাগ করে। অপারেশান টেবিলে বা  মটরগাড়ীর দুর্ঘটনায় বা আত্মহত্যার প্রচেষ্টায় যার ক্ষণিক-মৃত্যু হয়েছিল, তাদের সবাই একবাক্যে এবং এক ভাষায় বলেন এ সময়টিতে কখনই তারা তাদের চেতনা হারায় নি। প্রজাপতি যেমন তার শুককীটের দেহটি ছেড়ে বাইরে আসে তেমনি তারা তাদের দেহটি ত্যাগ করে বাতাসে ভেসে বেড়ান। তাদের দেহটি মনে হয় এক ধরনের সু² তন্তুতে তৈরী। তারা জানেন তাদের কি হয়েছে। তারা দেখতে পান, তাদের (আপাত) প্রাণহীন দেহ নিয়ে নীচে অকুস্থলে কে কি করছে। কে কি বলছে, শুনতে পান সবই। ডাক্তারদের, প্রাথমিক সাহায্যকারী, পুলিশ এবং উপস্থিত অন্যান্যদের যারা সবাই তার জীবন বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে তাদের সংখ্যা গোনেন, বা যেভাবে মটরগাড়ীর ধ্বংস্তুপ থেকে তার দেহটিকে বার করার চেষ্ট করা হচ্ছে। একজন ঘটনাস্থলে আগত মটরগাড়ীগুলির সব নম্বরও মনে রেখেছিল। অন্যরা স্মরণ করেন তার (মৃত অবস্থায়) শয্যাপার্শ্বে তার আত্মীয় স্বজনরা কি কথা বলাবলি করেছিল।

দ্বিতীয় ধাপ: রোগীদের এ সময়টির বর্ননায় এটাই বোঝা যায় যে (সাময়িক) মৃত্যুরপর তারা দেহ ত্যাগ করে এমন একটি অবস্থায় তাদের দেখতে পান যে যা শুধু একটা আত্মিক বা শক্তিরই (Energy) অস্তিত্ব হওয়া সম্ভব। তারা অত্যন্ত আনন্দিত হন যে কোন মানুষই একা মরে না। কোথায এবং কিভাবে তাদের মৃত্যু হল তাতে কিছুই আসে যায় না। তারা চিন্তার মত অসীম গতিতে যেখানে খুশী সেখানে যেতে পেরেছেন এবং এ যাওয়াটা ছিল উড়ন্ত। অনেকেই বলেছেন, দুর্ঘটনাস্থল থেকে দূরে বসবাস করা আত্মীয়রা খবর পেয়ে স্বভাবতই উদ্বিগ্ন হয়ে তাদের জন্য খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন। তারা তৎক্ষণাত সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন যদিও অনেকের স্বজন ভূগোলকের আরেকদিকে অবস্থান করছিলেন। এবং পরে প্রাণ ফিরে পেয়ে অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এসব বহু দূরের আত্মীয়দের কথা সবিস্তারে বলেছেন। অন্যরা যে সময়ে তাদের দেহ এ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, বলেন যে ঐ সময় তারা কর্মস্থলে সহকর্মী বন্ধুর সাথে দেখা করেছেন।
এ পর্যায়টি শোকগ্রস্থ আত্মীয় স্বজনের জন্য সবচাইতে সান্ত্বনাদায়ক। কারণ তারা যখন একজন প্রিয়জনের প্রাণবিয়োগে শোকাচ্ছন্ন, বিশেষ করে এটা যদি একটা দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক মৃত্যু হয়। মৃতব্যক্তি এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের সাথে সাক্ষাত করতে পারে। কারন ক্যান্সার বা অন্যান্য দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে যখন কেউ দীর্ঘদিন রোগে ভূগে মারা যায়, তখন তার আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের যথেষ্ট সময় হাতে থাকে আসন্ন মুত্যুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেবার। এ্যারোপ্লেনের দুর্ঘটনায় মৃত্যু একদম বিপরীত। যে এ ধরনের দুর্ঘটনায় সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় তখন ঘটনার আকস্মিকতায় সে এবং তার প্রিয়জনেরা সবাই বিভ্রান্ত হয়ে যায়। এ দ্বিতীয় ধাপে একটা সুযোগ থাকে কি হয়েছে তা জানার (মৃত ব্যক্তি নিজে এসেই অনেক সময় বলে)। আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে প্লেন দুর্ঘটনায় শত শত ব্যক্তির মৃত্যুর পরে যখন তাদের আত্মার শান্তির জন্য কোন শোকসভা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, সে সময় মৃতরা অবশ্যই সবাই সেখানে উপস্থিত হন। এ পর্যাযের সাক্ষাতকার নেবার সময় সবাই বলেছেন, তাদের ঠিক মনে আছে এ সময়ে তারা তাদের সাহায্যকারী-দেবদূতদের বা প্রয়াত আধ্যাত্মিক গুরুদের (মৃত) সাক্ষাত পেয়েছে। বা শিশুরা বলেছে, তারা তাদের ক্রীড়া সঙ্গীদের সাক্ষাত পেয়েছে। কিভাবে তারা তাদের সাথে খেলা করেছে। এ ছাড়াও প্রয়াত দাদা-দাদি, নানা-নানিরা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুরা এসে তাদের সান্ত্বনা দিয়েছে এবং নতুন পৃথিবীটি তাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখিয়েছে। এসব কথা স্মরণ করার সময় মৃত প্রিয়জনদের সাথে দেখা হবার অপার আনন্দের তারা উচ্ছসিত বর্ণনা দেন, কিভাবে তারা একে অপরকে আলিঙ্গন করেছেন, কত কথা বলেছেন।
তৃতীয় ধাপ: যার যার সাহায্যকারীর সাহচর্যে (দেবদূত বা প্রয়াত স্বজন) এখন যারা সাক্ষাতকার দিচ্ছিলেন তারা তৃতীয় ধাপে পৌঁছে যান। আগেই বলা হয়েছে তারা একধরনের সুড়ঙ্গ বা একটি বৃহৎ দরজা দিয়ে এ সময় চলাচল করেন। অবশ্য অন্যরা আরো অনেক ধরনের সড়কের কথা বলেন: সেতু, গিরিপথ বা একটি মনোহর নদী। এটির কারণ একটাই। মনে মনে সবাই তারা (যার যার পছন্দের) এ ধরনেরই একটা পথে উত্তরন করার আশা পোষন করেন। এ পথটি তারা তাদের নবলব্ধ প্রাকৃতিক শক্তি দিয়ে অতিক্রম করেন। সব পথের শেষেই একটি অভূতপুর্ব উজ্জল ও শুভ্র আলোক রশ্মি তাদের নজরে আসে।
এ আলোটি দেখার পরই তাদের মনে একটা অসীম প্রেম আর বর্ণনাতীত অনন্ত ভালোবাসার সঞ্চার হয়। একটা আধ্যাত্মিক শক্তি এ আলাকরশ্মি থেকে তাদের দেহে মনে সঞ্চালিত হতে থাকে। এরা বলেন, এ শক্তিটি সর্বোচ্চ এবং অনন্ত। তারা শান্তি  আর অশেষ খুশীর বোধে আচ্ছন্ন হয়ে যান। নিরবিচ্ছিন্ন স্বস্তি আর চিরতরে গৃহে ফিরে যাওয়ার প্রিয়তম আভাষে চিত্ত মহানন্দে স্নাত হয়। এ আলোকরশ্মিটি মহাশূন্যের সব শক্তির উৎস। অনেকে এ আলোকেই ঈশ্বর বা যীশুখৃষ্ট বা বৌদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্ত এ ব্যাপারে সবাই একমত যে তারা আলোটির মধ্যে প্রচণ্ড এক অনাস্বাদিতপূর্ব এবং গভীরতম ভালাবাসা বোধ করেছেন। এরকম নিখাদ ও সর্তহীন ভালাবাসার আর কোন উদাহারন তাদের জানা নেই। এসব বিবরন শোনার পর আমরা বুঝতে পারি কেন এসব প্রায় মৃতরা জীবন ফেরত পেয়ে মোটেই খুশী নন। এবং কেউ ফিরে আসতে চানও নি।
কিন্ত সব ফিরে আসা ব্যক্তিরাই বলেছেন এ অখন্ড ভালোবাসার এ আলোটি তাদের জীবনে প্রচন্ড প্রভাব বিস্তার করেছে। এটি একটি অসামান্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। অনেকেই পরে জ্ঞানী ব্যক্তির মত আচরণ করেছেন। কেউ প্রেরিত পুরুষের মত বাণী নিয়ে ফিরেছেন। অনেকেই জীবনযাত্রা প্রণালীর আমূল পরিবর্তন করেছেন। আবার প্রত্যেকেই একই আধ্যত্মিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। আলোকরশ্মিটি দেখে তাদের একটাই শিক্ষা হয়েছে। জীবনের অর্থ কি? এর একটাই উত্তর: প্রেম।
চতুর্থ ধাপ:এ ধাপে বর্ণনাকারীরা বলেছেন তারা এ সময়ে সৃষ্টির উচ্চতম উৎসটি দেখতে পেয়েছেন। অনেকে বলেছেন এটাই বিধাতা। অন্যরা বলেন তারা অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের যাবতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান সব যার মধ্যে মিলেমিশে গেছে তার সামনা-সামনি হয়েছিলেন। এটি ছিল নিরপেক্ষ এবং ভালাবাসায় ভরা। এখানে যারা আসে তাদের আর সু² তন্তুর গাত্রের প্রয়োজন নেই। তারা সবাই এখন একটি আধ্যত্মিক শক্তিতে রূপান্তরিত। মানুষের পার্থিব দেহটি এখানে মূল্যহীন। যার যেটা ভাগ্যে আছে (কর্মফল?) সেভাবেই মানুষ ও বর্তমান আধ্যাত্মিক অস্তিত্বের দুই প্রান্তের মধ্যে সামনের চিরস্থায়ী রূপান্তরটি ঘটবে। অস্তিত্বের ঐক্য আর সামগ্রীকতার অভিজ্ঞতাটি এ সময়েই তার সামনে আসে।
তার সারা জীবনের সমস্ত ঘটনা প্লেব্যাক-চিত্রাবলী হয়ে তার সামনে আসে। যা পিছু ফিরে দেখায় এবং তার গোটা (পার্থিব) অস্তিত্বটিকে সে আরেকবার হিসাব নিকাশের দাঁড়ীপাল­ায় দেখতে পায়। তার সারা জীবনের প্রতিটি কর্ম, ব্যবহৃত শব্দ এবং চিন্তাভাবনা প্রত্যক্ষ করে। সাথে সাথে সে দেখতে পায় কখন কোন সিদ্ধান্ত সে কেন নিয়েছিল, চিন্তার পেছনে কি যুক্তি ছিল, কর্মটিই বা সে কেন করেছিল?  সে বুঝতে পারে তার যাবতীয় ক্রিয়াকর্ম দ্বারা চেনা অচেনা সবাই কেমন প্রভাবান্বিত হয়েছিল। সে আরও উপলব্ধি করে সে তার জীবনে কি হতে পারত, আরও কি কি করতে পারত, কি সম্ভাবনা তার ছিল? এটা তাকে দেখানো হয় যে সবাই একে অপরের সাথে জড়িত (কেউ একাকি বাঁচতে পারে না)। প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি কর্মের বলতে গেলে একটা ঢেউয়ের মত প্রতিক্রিয়া আছে যা পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর গায়ে এবং আমদের এ গ্রহটিতেও নিয়মিত  আঘাত করে। মৃত্যু-বিশেষজ্ঞরা বলেন এটাই স্বর্গ বা নরক। বোধহয় দুটিই।   
স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা মানুষের সবচাইতে বড় শক্তি, যা সর্বদা দায়িত্বজ্ঞানের পরিপূরক। দায়িত্বটি হল, সঠিক, মঙ্গলময়, যথাযথ ও সুস্থ চিন্তা করে সু্িববেচনার পরই সিদ্ধান্ত নেয়া। সিদ্ধান্ত যা পৃথিবীর কাজে আসে, যা মানুষের জন্য কল্যাণকর। সাক্ষাতদাতা বলেন এ পর্যায়ে, তাকে প্রশ্ন করা হয়, তুমি অন্যের ভালোর জন্য কি করেছ? এর চাইতে শক্ত ও কঠিন প্রশ্ন বোধহয় মানুষের জীবনে আর নেই। কারণ এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই নিহিত আছে সে চরম সত্যটি: সে কি তার জীবনে তার সবচাইতে বড় শক্তিটি (স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা) সঠিকভাবে ব্যবহার করেছে? জীবনের যাবতীয় শিক্ষার মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ট ও সর্বোচ্চটি  হল ‘শর্তহীন ভালোবাসা’, এটা কি আমরা সবাই গুরুত্ব দিয়ে যথার্থভাবে শিখেছি বা আদৌ শিখতে চাই?
জীবনের মাপকাঠিকে ঠিকমত ব্যবহারের জন্য মৃত্যু সর্বদা আমাদের দিকে তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে থাকে। কিন্ত আমরা মৃত্যুকে জীবনের জন্য একটা শাস্তি মনে করে একে আমাদের শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত করি। মৃত্যু আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্যটির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এবং সেটি হল মনের সমৃদ্ধি এবং পূর্ণ বিকাশের প্রয়াশ যা আমাদের ‘স্বয়ং’ টিকে চেনার পথে নিয়ে যায়। বেদে একই বলা হয়েছে ‘আত্মানং বিদ্ধি’-  নিজেকে চেনো। মৃত্যু জানায় আমাদের জীবন সীমাবদ্ধ, জ্ঞানার্জনের সময়ও সীমিত। মুক্ত জীবন আনন্দের পূর্ব শর্ত। আমরা সবাই আনন্দে বাঁচতে চাই। জীবনের সাথে আমাদের মিত্রতার অর্থ এই নয় যে তার যে সীমা তাকে সম্পূর্ণ ভুলে থাকা। কবিগুরু বলেছেন সীমার মাঝে অসীম তুমি। আমাদের পার্থিব জীবন সসীম এবং যেখানে আমাদের চিরযাত্রা, সেই অসীমের পথে মৃত্যুই আমাদের হাত ধরে নিয়ে যায়। কাজেই জীবনের মতই মৃত্যুও নি:সন্দেহে আমাদের পরম সুহৃদ। এটাই পরম সত্য। (শেষ)
নয়ে-ইজেনবুর্গ, জার্মানি, alharunabdullah1@gmail.com


 
এ পর্যন্ত সর্বাধিক পঠিত

  ইনফোটেক : ইন্টারনেট নিয়ে গ্রাহক প্রতারণা!
  অনুসন্ধান : কয়টি সিম রাখা যাবে?
  পোস্টমর্টেম : নকল ডিমে রাজধানী সয়লাব
  প্রবাস : চিতোর, ইতিহাসের তিন নারী
  সাহিত্য : নাথ সাহিত্যের স্বরূপ
  অর্থনীতি : মূল বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশজাতীয় বেতন কমিশনের রিপোর্টে যা আছে
  আন্তর্জাতিক : যেভাবে যৌনদাসীদের ভোগ করছে আইএস জঙ্গিরা
  সমকালীন : বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কূটনীতির দৃষ্টিতে মোদীর ঢাকা সফর
  বিশেষ প্রতিবেদন : ক্যাপ্টাগন: জঙ্গিদের টেরোরিস্ট ড্রাগ!
  প্রশাসন : চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল হচ্ছে!
  সাহিত্য : শিরোমণি আলাওল
  আন্তর্জাতিক : ভয়ঙ্কর আইএস-এর উত্থান ও নৃশংসতা!
  চমক! : জমজমের পানি নিয়ে জাপানী বিজ্ঞানীদের রহস্য আবিষ্কার!
  সাহিত্য : মগের মুল্লুকে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ
  প্রচ্ছদ প্রতিবেদন : গুলশান ট্র্যাজেডি! কেন এই নৃশংসতা?
 





free counters



উপদেষ্টা সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল-হারুন   |  সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ জিয়াউল হক   |  প্রধান সম্পাদক : আসিফ হাসান

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: দেওয়ান কমপ্লেক্স, ৬০/ই/১ (৭ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: +৮৮-০২-৯৫৬৬৯৮৭, ০১৯১৪ ৮৭৫৬৪০  |  ফ্যাক্স: +৮৮-০২-৯৫৬৬৩৯৮

ইমেইল: editor@weeklymanchitra.com, manchitra.bd@gmail.com
©  |  Amader Manchitra

Developed by   |  AminMehedi@gmail.com