আমাদের মানচিত্র  |  বর্ষ: , সংখ্যা:     ঢাকা, বাংলাদেশ  |  আজ শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭  |  




চলতি সংখ্যার প্রচ্ছদ



বর্ষ: ৪, সংখ্যা: ৪৪
রবিবার, ১ জানুয়ারী ২০১৭










free counters






বিশ্লেষণ পড়া হয়েছে ৪৭৩ বার

রোহিঙ্গা নিধনে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ ও

ভূরাজনীতির সঙ্কটে বাংলাদেশ!

মৃণাল দেবনাথ


মিয়ানমারে মুসলমানের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ। বেশির ভাগই বাস করেন রাখাইন (আরাকান) প্রদেশে। অনেকটা বোয়াল মাছের আকৃতির এই অঞ্চলের অনেক অধিবাসী ইসলামের অনুসারী। তাদের মধ্যে থাম্বাইক্যা, জেরবাদী, কামানচি, রোহিঙ্গা প্রভৃতি নামে মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। রোহিঙ্গারা তাদের মধ্যে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হওয়ায় সাধারণত সব আরাকানি মুসলিম রোহিঙ্গা নামে অভিহিত।
দুই মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চলছে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর নামে বর্বরোচিত নির্যাতন। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষীরা মিলিতভাবে চালাচ্ছে নারকীয় নিপীড়ন। ৯ অক্টোবরের পর থেকে রাখাইন প্রদেশে বিদেশী সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। তারপরও বিভিন্ন মিডিয়া এবং স্যাটেলাইটে বর্মি সেনার অত্যাচারের দৃশ্য ধরা পড়েছে। এ ছাড়া প্রাণের ভয়ে বাংলাদেশে আসা হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের মুখে মুখে নির্যাতনের কাহিনী শোনা গেছে, যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রতিদিন প্রকাশ হচ্ছে। তা এক কথায় অতীতের নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে হার মানায়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যে প্রকাশ, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী সংখ্যা ২১ হাজার। মৃতের সংখ্যা অন্তত কয়েক শ’। রোহিঙ্গা দমন-পীড়নের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাকে দূষছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এবং ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রাসির নেত্রী অং সান সু চি। সিঙ্গাপুরে সফরে গিয়ে নিউজ এশিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সু চি বলেন, আন্তর্জাতিক মহলের ‘নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি’ মিয়ানমারের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ ও সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত ৯ ডিসেম্বর রাখাইন পরিস্থিতি দেখে আসার জন্য জাতিসঙ্ঘ সু চিকে আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা নির্যাতনের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকায় অনেকেই দেশটির প্রকৃত শাসক অং সান সু চির তীব্র সমালোচনা করছেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক তার দেশে বিশাল জনসমাবেশে বিরোধী দল এবং মন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সু চিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘অনেক হয়েছে, এবার থামুন। আপনার সেনাবাহিনীকে নিবৃত্ত করুন। তা না হলে আমরা নিশ্চুপ বসে থাকব না।’ ওই দেশের একজন সিনিয়র মন্ত্রী মিয়ানমারকে আসিয়ান থেকে বের করে দিতে আহ্বান জানান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলেন, মিয়ানমারকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে মাত্র কয়েক মিনিট লাগবেÑ যদি এই গণহত্যা অবিলম্বে বন্ধ না করা হয়। প্রতিবাদমুখর হয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ ও বিবেকবান মানুষ। বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, দেশে প্রবেশ করা হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
মিয়ানমারে দীর্ঘ দিন সামরিক সরকার ক্ষমতায় ছিল। ২০১৫-তে সেনা সরকারের দেয়া সাধারণ নির্বাচনে সু চির এনএলডি দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে পার্লামেন্টে। কিন্তু সু চি দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য। পরে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ‘প্রধান নির্বাহী’ পদ সৃষ্টি করে সু চিকে ক্ষমতার মগডালে আরোহণ করতে হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর সু চি গৃহবন্দী থেকে মুক্ত হয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গণতন্ত্রের শকটটি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, এমনটাই ধারণা। এখনো সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ খুব একটা আলগা হয়নি প্রশাসনে।
মংডু ও বুথিডংয়ে সীমান্তরক্ষীদের চৌকিতে কথিত হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে ‘আকুয়ামুল মুজাহিদিন’ নামে একটি অপরিচিত জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে। এই হামলাকে কেন্দ্র করে জাতিগত নির্মূলের যে নারকীয় অভিযানে নেমেছে বর্মি সেনা, তা বিশ্ববাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
২০১২ সালে রাখাইনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চালানো রক্তক্ষয়ী সহিংসতা এবং ২০১৫ সালে নিরাপত্তাবাহিনী জোর করে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রে নৌকায় নামিয়ে দিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া পাঠিয়ে দেয়া এবং অনেক আগে ১৯৭৮ সালে একই ধারার নির্যাতন করে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া গভীর ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়।
মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী মার্মা, ম্রো ও লুসাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। এমনকি আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় পাঁচ হাজার উপজাতীয় লোক এসব এলাকায় বসতি গড়ে তুলেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাতিসঙ্ঘ প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন পরিদর্শনে নিয়ে যায় মিয়ানমার সরকার। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে তাদের কেবল অরোহিঙ্গাদের বাছাই করা এলাকাগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কফি আনান রোহিঙ্গা মুসলমানদের পরিস্থিতি সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বৌদ্ধদের প্রতিরোধের মুখে পড়েন। অং সান সু চির দল সরকার গঠনের পর রাখাইন পরিস্থিতির সুরাহার জন্য আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেছে।
কিন্তু এ কমিশনকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। এর মূল কারণ, রোহিঙ্গা মুসলমানদের সমস্যার সুরাহা করার মনোভাব সু চিরও নেই, যেমনি সামরিক কর্তৃপক্ষ এর বিরোধী। রাখাইন প্রদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে প্রশ্ন আসবে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনার। রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার জন্য সু চির সরকার ‘রাখাইনের মুসলিম’ বলে তাদের পরিচয় নির্ধারণ করেছে। আগের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সরকার দায়িত্ব জ্ঞানহীনভাবে ‘বাঙালি’ বলে তাদের চিহ্নিত করেছিল। অথচ অং সান সু চির বাবা জেনারেল অং সান ১৯৪৮ সালের সংবিধানে রাখাইনে বসবাসরত মুসলমানদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৬৬ অব্দ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছরের স্বাধীন সত্তা, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা, রাজনৈতিক ঐতিহ্য প্রভৃতির অধিকারী এই রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশের কক্সবাজার ও রামুসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের একটি বিশাল অংশ দীর্ঘ দিন ধরে আরাকানের শাসনাধীন ছিল। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের পর থেকে এর আয়তন ২০ হাজার বর্গমাইল। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতার পর উত্তর পার্বত্য আরাকান অঞ্চল বার্মার চীন প্রদেশে এবং দক্ষিণ আরাকানের কিছু অংশ লোয়ার বার্মার অন্তর্ভুক্ত করায় বর্তমানে প্রদেশটির আয়তন ১৪,২০০ বর্গমাইল। রোহিঙ্গা মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪,২৪,০০০ থেকে ২০,০০,০০০ বলা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার মিয়ানমারে, ৪ লাখ সৌদি আরবে, বাংলাদেশে ৫ লাখ, পাকিস্তানে ২ লাখ, থাইল্যান্ডে ১ লাখ, মালয়েশিয়ায় ৪০ হাজার ৭০, ইন্দোনেশিয়ায় ১১ হাজার ৯৪১ এবং নেপালে ২০০।
ভূমধ্যসাগরে শরণার্থীদের মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল এবং শিশু আইলানের মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা লাশটি বিশ্ববিবেক নাড়া দিয়েছিল। একই দৃশ্য তো আমরা নাফ নদীর তীরে ১০ মাসের রোহিঙ্গা শিশু মুহাম্মদ তোয়াহাকে দেখলাম- কিন্তু কোথায় বিশ্ববিবেক?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, সামরিক উপায়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘ দিন সামরিক শাসনাধীন থাকা মিয়ানমার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে থেকেই সামরিক শক্তিতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার দৈনিক মর্নিং হেরাল্ড বেশ কয়েক বছর আগেই জানিয়েছে, পাঁচ বছরের মধ্যে পরীক্ষামূলক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর লক্ষ্যে উত্তর মিয়ানমারের পার্বত্য এলাকায় (রাখাইন প্রদেশের কাছে) একটি প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর যোগ্যতা অর্জন করেছে। সামরিক সমীক্ষা চালায় এমন আন্তর্জাতিক সংস্থা জিএফপি পাওয়ার ইনডেক্সে ১২৬টি দেশের মধ্যে মিয়ানমারের ৩৩তম স্থান। আর বাংলাদেশের অবস্থান ৫২তম। ৫ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার মানুষের দেশ মিয়ানমারের সামরিক বাজেট ২৪০ কোটি ডলার। পক্ষান্তরে ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের সামরিক বাজেট ১৬৯ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের স্থল সীমান্ত ১৯৩ কিলোমিটার। ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই মিয়ানমার সরকার এ দেশের সাথে সমুদ্র সীমানা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছে।
মিয়ানমার এখন বাংলাদেশের জন্য নানা কারণে মাথাব্যথার কারণ। এর সুরাহা করার জন্য বাংলাদেশকে পরিবর্তিত ভূরাজনীতির বিষয়ে ভাবতে হবে। এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট, মিয়ানমারের ওপর চীন প্রভাব ধরে রাখতে চায়। চীন সেখানে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। সু চি বেইজিং সফর করে অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগের আশ্বাস লাভ করেছেন। পাশ্চাত্য দেশগুলো এবং ভারত মিয়ানমারে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু এ ব্যাপারে চীন এগিয়ে আছে অনেক ব্যবধানে। তা ছাড়া মিয়ানমারের সামরিক শক্তিতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার পেছনেও রয়েছে চীনের অবদান। রাশিয়াও এই কার্যক্রমের অংশীদার। এ কারণে নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো প্রস্তাব আনা যায়নি। রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে ১৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে সেখানে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। তবে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত। চীন-রাশিয়ার প্রভাবে মানবাধিকার ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর জোরালো চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যরা। সু চির সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর যত মধুর হোক- মিয়ানমার যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা দ্বিতীয় সফরে বুঝতে পারেন।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নেয়া ক্রমান্বয়ে আরো জটিল রূপ পরিগ্রহ করবে। ৩৮ বছরেও আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারিনি। এ জন্য আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত করতে হবে। এমনিতেই আলোচনার টেবিলে মিয়ানমার আসবে না। ‘স্ট্র্যাটেজিক রিলেশনস’-এর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। বাংলাদেশকে ভারতের যেমন খুবই প্রয়োজন, তেমনি চীনেরও। দুই দেশের ঐতিহাসিক বিরোধকে এক পাশে সরিয়ে রেখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে কূটনৈতিক প্রয়াস অবিলম্বে চালাতে হবে। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাজে লাগানো যেতে পারে।
রাখাইন অঞ্চল কেবলি হত্যাযজ্ঞের প্রান্তর
ফাওয়াদ কাওসার: রোহিঙ্গাদের জন্যে বিকল্প হচ্ছে মিয়ানমার থেকে উধাও হয়ে যাওয়া। কিন্তু যতক্ষণ মিয়ানমারের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না হচ্ছে, ততদিন রোহিঙ্গাদের জন্যে তাদের জন্মভ‚মি নরক হয়েই থাকবে কেবল। তারপরও হাজার হাজার রোহিঙ্গা চেষ্টা করছে ক্ষুদ্র নৌকায় করে প্রাণটুকু বাঁচানোর জন্যে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্যে। মিয়ানমারে মুসলমানদের অবস্থা ক্রমাগত সঙ্গীন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলে মুসলমানরা রয়েছে ভয়ঙ্কর হুমকির মুখে। যদিও ১০ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়েছে, যারা ৫২ মিলিয়ন বৌদ্ধ অধ্যুষিত এ দেশটিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস করে আসছে, তাদের এখন মিয়ামারের নাগরিকরা বাংলাদেশ থেকে আসা বহিরাগত ভাবছেন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা তাই সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হাতে নিষ্পেষণের শিকার, সন্ত্রাস ও বৈষম্যের কারণে তারা নির্যাতিত, তাদের হত্যা করা হচ্ছে ও রোহিঙ্গা নারীরা ধর্ষণের শিকার হলেও তাদের এ দুর্দশায় বিশ্ববিবেক নিশ্চুপ। যদিও কিছু মানবাধিকার সংগঠন রোহিঙ্গাদের হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনকে জাতিগত নির্মূল বলছে।
২০১২ সালে মিয়ানমারে গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ২ শতাধিক মানুষ নিহত, ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ দেশটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায় যাদের সিংহভাগ রোহিঙ্গা মুসলিম। তখন এক জঘন্য প্রচারণা শুরু হয়ে যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের কারণেই মিয়ানমারে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ছে। এটা ঠিক যে মিয়ানমারে সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা মুসলমানদের ঘৃণা করেন এবং এ ঘৃণা শেষপর্যন্ত সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে পরিণত হয়, ক্ষোভের সঞ্চার করে এবং পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়ে।
এরপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন অঞ্চলে রোহ্ঙ্গিা মুসলমানদের হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়, রোহিঙ্গা নারীরা ধর্ষণের শিকার হতে থাকেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এধরনের নির্যাতনের অভিযোগ করে। অন্তত ৩০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান তাদের ঘর বাড়ি ছেড়ে সরে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্যাটেলাইট ছবির ব্যবহার করে দেখতে পায় রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোতে শত শত বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মিয়ানমার সরকার এধরনের নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে বলে, রাখাইন অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।
এমন প্রেক্ষাপটে অং সাং সুচি যিনি তার দেশে গণতন্ত্রী হিসেবে সুপরিচিত, মিয়ানমারের স্টেট অব দি কাউন্সিল, তার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে তার সুপ্রভাবের ক্ষমতা বিশ্ববাসীর অজানা নয়। কিন্তু জাতিসংঘের আহবান সত্তে¡ও এখনো রাখাইন অঞ্চলে যাননি, তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন মাত্র। শান্তিতে এই নোবেল জয়ী মনে করেন, রোহিঙ্গাদের বাঙ্গালী বলা উচিত, তাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা মাত্র। সুচি মনে করেন, তার দেশে রাখাইন অঞ্চলে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে তা অতিরঞ্জিত। অথচ রাখাইন অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মিডিয়া, ত্রাণকর্মীরা যেতে পারছে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নির্যাতিত রোহিঙ্গারা অনাহারে ও প্রাণ বাঁচানোর দায়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছে, তাদের কেউ কেউ নৌকায় নাফ নদীতে ভাসছে, তাদের গুলি করে হত্যার মত ঘটনাও ঘটছে।
এর আগে রাখাইন অঞ্চলে ত্রাণ তৎপরতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি চরম অবস্থায় পৌঁছেছে। রোহিঙ্গা গ্রামগুলো জনমানবহীন। ঘরবাড়িগুলো আগুনে পুড়ে গেছে। ক্ষেতের পাকা ফসল কাটার কেউ নেই। ইউনিসেফ সাবধান করে দিয়ে বলেছে, হাজার হাজার রোহিঙ্গা শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, কোনো স্বাস্থ্য সুবিধা এমনকি চিকিৎসা পর্যন্ত পাচ্ছে না। মিয়ানমার সরকারের উচিত সেখানে ত্রাণ ও চিকিৎসা সুবিধা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে রাখাইন অঞ্চলে নিরপেক্ষ তদন্তের আহবান জানিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমার সরকারের কাছে জাতিসংঘের সহায়তা নেয়ার কথা বলেছে।
মানবাধিকার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে অং সাং সুচির প্রয়োজন তার ভাবমূর্তি রক্ষা করা। সুচির রাজনৈতিক দল দশকের পর দশক ধরে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে ভ‚মিধস বিজয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং সে ক্ষমতার শীর্ষে রয়েছেন সুচি। একজন মানবাধিকার যোদ্ধা হিসেবে সুচি রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশা লাঘবে কেন তবে ব্যর্থ হবেন?
মিয়ানমারে ঔপনিবেশিক আমলে যখন ভারতীয়রা আসতে শুরু করে যাদের অধিকাংশ ছিল মুসলিম, তাদের অনেকে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে এবং সৈন্য হিসেবে দেশটিতে আসতে শুরু করে। এ বিষয়টি মিয়ামারের বৌদ্ধ সম্প্রদায় ভালভাবে নেয়নি। বছরে পর বছর ধরে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মনেও এ নিয়ে ক্ষোভ জমা হতে থাকে। এর পাশাপাশি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের তুলনায় মুসলিমদের জনসংখ্যা বৃ্িদ্ধ পাওয়ার ফলে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাঝে এ বিষয়টিও নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। তারা আশঙ্কা করেন যে এভাবে মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে গেলে তা মিয়ানমারের নৃতাত্তি¡ক চরিত্রকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত থাকায় তাদের অনেকেই মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর চলে গেছেন। বৌদ্ধ গ্রাহকদের অসহযোগিতার কারণে মিয়ানমারে মুসলিম ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা হারিয়েছেন। নাইন সিক্স নাইন নামে বৌদ্ধ আন্দোলন বেশ কিছু দেশের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয় যে আন্দোলনের লক্ষ্যই ছিল মুসলমানদের তৈরি পণ্য ও ব্যবসা এড়িয়ে চলা ও মুসলিমদের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক না রাখা। এ আন্দোলনকারীরা দাবি করেন তারা কোনো সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়, কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এধরনের ঘৃণা, সামাজিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলা, মুসলমানদের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন না করার মনোভাব ক্রমান্বয়ে রোহিঙ্গাদের হত্যাযজ্ঞ, নারীদের ধর্ষণ, তাদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দেয়ার মত সহিংসতায় রুপ নেয়।
এধরনের পরিস্থিতির পেছনে উগ্র জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ‘মা বা থা’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন যার উদ্দেশ্য হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মকে সুরক্ষা করা। ২০১৪ সালে ‘মা বা থা’ আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা এখন দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। গত বছর এ সংগঠনের প্রভাবেই মিয়ানমারে ‘প্রটেকশন অব রেস এন্ড রিলিজিয়ন ল’স নামে যে আইনটি প্রণয়ন হয় এবং তারই প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার হারাতে থাকেন। এর আগে ১৯৮২ সালেই তাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করা হয়। ‘মা বা থা’ সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মিয়ানমারে এক ঘরে করার জন্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। অব্যাহতভাবে প্রচারণা চলতে থাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। মিয়ানমারের পুরো সমাজ এভাবেই মুসলিম বিরোধী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে পড়ে। পদে পদে রোহিঙ্গা মুসলিমরা বৈষম্যের শিকার এমনকি মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম মাত্রই ঘৃণার বস্তু‘।
এই ধরনের মারমুখি অপপ্রচার সত্তে¡ও রোহিঙ্গা মুসলমানরা শান্ত ও সুস্থির থাকে। সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতা বা বৌদ্ধ সন্ত্রাস তাদের ওপর যাতে আরো চেপে না বসে এজন্যেই রোহিঙ্গা মুসলমানরা পারতপক্ষে নিজেদের বেঁচে থাকার ওপরই কেবল মনোযোগ রাখার চেষ্টা করে। এখন পর্যন্ত রাখাইন অঞ্চল সিরিয়্,াআফগানিস্তান, চেচনিয়া অথবা কাশ্মীর হয়ে ওঠেনি, কোনো বিদেশি তরুণ তরুণী রাখাইনে সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু করেনি, আইএস জঙ্গিদের সঙ্গে ইরাক ও সিরিয়ায় এসে যোগ দেয়ার মত রাখাইনে আসেনি কারণ জঙ্গিদের পথভ্রষ্ট করে খিলাফত কায়েমে বিভ্রান্ত করার সুযোগ রাখাইন অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় কৃষিনির্ভর, জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মুসলিমরা দেয়নি। যাদের অধিকাংশ গরিব ও দিন আনে দিন খায়।
দ্বিতীয়ত মিয়ামারের সীমান্ত প্রহরা শক্তিশালী ও এর প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীরা বেশ কড়া নজর রাখে। বিদেশি জিহাদীদের পক্ষে এ অঞ্চলে ঘাঁটি গড়ে তোলা সহজ ব্যাপার নয়। তৃতীয়ত নরওয়ের ইসলাম বিশেষজ্ঞ থমাস হেগাঘামার বলেন, জঙ্গিরা কখনো মুসলিমদের দুর্দশায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে না, তারা সেখানেই যায় যেখানে মুসলিমরা যুদ্ধে লিপ্ত। তাই রাখাইন এখন যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে অনেক বেশি হত্যাযজ্ঞের প্রান্তর। কিন্তু ঝুঁকি ও মতভেদ দুই পাল্টে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে।










  একনজরে চলতি সংখ্যা

  সম্পাদকীয় : স্বাগত ২০১৭! প্রশস্ত হোক সমৃদ্ধি অর্জনের পথ
  গল্প : অন্তরালবাসিনী
  অনুগল্প : দোলা
  ফিচার : জিগোলো! রমরমা এক ব্যবসা
  প্রবাস : মৃত্যুর অধিকার
  বিশ্লেষণ : রোহিঙ্গা নিধনে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ ও ভূরাজনীতির সঙ্কটে বাংলাদেশ!
  চমক! : পলিটিশিয়ান অব দ্যা ইয়ার শেখ হাসিনা
  মতামত : রাজধানীর যানজট সমাধান অসম্ভব নয়
  আন্তর্জাতিক : ট্রাম্পের পরমাণু ঘোষণায় ভয়ংকর পথে বিশ্ব!!
  প্রচ্ছদ প্রতিবেদন : ইমেজ সংকটে বিমান!
  অনুসন্ধান : ইতিহাসের কালো অধ্যায়, মানুষ হয়েছে গিনিপিগ!
  রাজনীতি : রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপ, বাড়ছে অচলাবস্থা অবসানের প্রত্যাশা
  মুক্তিযুদ্ধ : অপারেশন নাট ক্র্যাক
  বিশেষ প্রতিবেদন : জামায়াতের অন্তর্দ্ব›দ্ব চরমে...
  প্রতিবেদন : নাসিকে পরাজয়ে বিএনপিতে অস্বস্তি
  স্বাস্থ্য : অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও স্বাস্থ্যহানির ভয়ঙ্কর ঝুঁকি
  ফিচার : মাঞ্জারুল ইসলাম জিপিএ ৫ পেয়েছে
 
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল-হারুন   |  সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ জিয়াউল হক   |  প্রধান সম্পাদক : আসিফ হাসান

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: দেওয়ান কমপ্লেক্স, ৬০/ই/১ (৭ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: +৮৮-০২-৯৫৬৬৯৮৭, ০১৯১৪ ৮৭৫৬৪০  |  ফ্যাক্স: +৮৮-০২-৯৫৬৬৩৯৮

ইমেইল: editor@weeklymanchitra.com, manchitra.bd@gmail.com
©  |  Amader Manchitra

Developed by   |  AminMehedi@gmail.com